Wednesday , February 20 2019
সর্বশেষ
Home / কৃষি বিভাগ / কৃষিবিদ দিবস ২০১৯ উপলক্ষে বাকৃবি ভিসির বাণী

কৃষিবিদ দিবস ২০১৯ উপলক্ষে বাকৃবি ভিসির বাণী

কৃষির গৌরবোজ্জ্বল অগ্রগতির পাঁচ দশক

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ(বাকসু) কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন মন্ডপে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় যোগদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে আগমণ করেন এবং ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের মত কৃষিবিদদের চাকুরী ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর পদ মর্যাদা ঘোষণা দেন। তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণার পথ ধরেই আজ কৃষিবিদগণ সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কৃষি শিক্ষা ও কৃষিবিদদের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদা প্রদানের ঐতিহাসিক ঘোষণা আজও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে স্লোগান হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধুর অবদান-কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান’ সোচ্চার কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জাতির জনকের স্মৃতি জাগানিয়া ঐতিহাসিক স্থানটি চিহ্নিত করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি চত্বর’। জাতির জনকের দেয়া কৃষিবিদদের ঐতিহাসিক এ সম্মানকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে কৃষিবিদগণ দিবসটিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছেন। এ বছর আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দিবসটি পালনে ক্যাম্পাসে আলোকসজ্জা, আতশবাজি, ফানুস উড্ডয়ন, আনন্দ শোভাযাত্রা, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে কৃষি উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত ও সংহত করার ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণ বিষয়ক ‘টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট অর্জনে আধুনিক কৃষি’ বিষয়ক একটি জাতীয় সেমিনার, কৃতি অ্যালামনাই সংবর্ধনা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্যে পরম আনন্দ ও গৌরবের।
বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি উন্নয়ন মূলত জাতীয় উন্নয়নেরই সমার্থক। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির জীবন জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষিতে অভাবনীয় উন্নয়ন সাধন করায় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ আজ খাদ্য শস্য উৎপাদনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। সেই সাথে ক্রমাগত মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ফল ও শাকসবজির উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত গতিতে। দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের প্রচেষ্টায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি যথেষ্ট সহায়ক ভ’মিকা পালন কওে যাচ্ছে। বহুলাংশে এ সফলতার গর্বিত অংশীদার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এখন প্রয়োজন খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন তথা গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশকে অবারিত করার মাঝেই নিহিত। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল, প্রয়োজন উচ্চ প্রশিক্ষিত কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানী। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ পৃথিবীতে চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আম উৎপাদনে ৭ম, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে ৩য়, ধান উৎপাদনে ৪র্থ, পাট রপ্তানীতে ১ম, পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম স্থান অর্জন করেছে এবং শাক-সবজি ফল উৎপাদনে বিস্ময়কর সফলতা বৃহত্তর কৃষি উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৬ শতাংশ। স্বাধীনতার পর হতে গত প্রায় পাঁচ দশকে কৃষি জমি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেলেও শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চার গুন। বাংলাদেশে কৃষির ক্রমোন্নতি ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ কর্মকান্ডে নিয়োজিত দক্ষ কৃষিবিজ্ঞানীদের প্রায় সবাই ময়মনসিংহে অবস্থিত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশের প্রথম উচ্চতর কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার ঐতিহ্যবাহী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। এ যাবত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪৭,২৬৮জন গ্রাজুয়েট যার মধ্যে ২৮,১২৯জন স্নাতক, ১৮,৪১৬ জন এম.এসসি./এম.এস. এবং ৭২৩ জন পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেছেন। খাদ্য-শস্য উৎপাদনসহ কৃষির এ বিরল সাফল্য অর্জনে দেশের লাখো-কোটি কৃষকের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে উত্তীর্ণ কৃষিবিদদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। ক্রমবর্ধমান বিপুল জনসংখ্যার বাংলাদেশে মানসম্মত উচ্চতর কৃষি শিক্ষাদান এবং কৃষি উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব বহনে সমর্থ দক্ষ কৃষিবিদ, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করাই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)নির্ধারণ করেছেন। সে অনুযায়ী ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদিত শক্তি ও উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশণ ২০২১ ও ২০৪১ সালের জন্য উন্নয়নের রুপকল্প ঘোষণা করেছেন। সেইসাথে আগামী ২১০০ সাল পর্যন্ত ডেল্টা প্ল্যান তৈরীও সম্পন্ন করেছেন। তাঁর এ ঘোষণা বাস্তবে রুপ দিতে শোষিত – বীরের জাতিকে মানব সম্পদে রুপান্তর করতে হবে। বাংলাদেশের খাদ্যঘাটতি পূরণ, পুষ্টি সরবরাহ, আত্মকর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এসডিজি’র এ লক্ষ্য মাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের ফসল খাতের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যসম্পদের গুরুত্ব অপরিহার্য।

আগামী দিনগুলোতে কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো পরিবেশ রক্ষা, জমির একক প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ূ পরিবর্তনের ঝুকি মোকাবেলা, মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি ও ঝুকি মোকাবেলা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ,কৃষিতে আইসিটির ব্যবহার এবং সকলের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধান করা। ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাণীজ কৃষির বিকাশের মাধ্যমে এ লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অতীতের ধারাবাহিকতায় আগামী দিনের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ গ্রাজুয়েট সৃষ্টি এবং কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টারের মাধ্যমে কৃষি গবেষণায় ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরষ্কার-১৪১৯’ স্বর্ণপদক লাভ আমাদের অন্যতম অর্জন। এ ছাড়া ২০১৭ ও ২০১৮সালে ওয়েবমেট্রিক্স র‌্যাংকিং অভ দ্যা ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিসে বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

কৃষির এ অর্জনের মাধ্যমেই জাতির এ মহা নায়কের সম্মান রক্ষা করেছে কৃষিবিদ সমাজ। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদ মর্যাদা প্রাপ্তির দিনটিকে কৃষিবিদ দিবস হিসেবে পালনের তাৎপর্য এখানেই। আমরা বিশ্বাস করি যথাযথ পরিকল্পনা ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এর শিক্ষা ও গবেষণাসহ যাবতীয় কর্মকান্ডের বিকাশ অব্যাহত থাকবে এবং এর মধ্য দিয়েই কৃষি তথা জাতীয় উন্নয়নে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন আরো ফলপ্রসূ হবে – এধারা অব্যাহত রাখতে আমরা প্রতিশ্রুত।

প্রফেসর ড. মোঃ আলী আকবর
ভাইস চ্যান্সেলর
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,ময়মনসিংহ ২২০২।

প্রেরণ মো. শাহীন সরদার
বাকৃবি প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ ২২০২।

About Editor

Check Also

রাসায়নিক দূষণ মুক্ত নিরাপদ ব্রয়লার উৎপাদনে খামারীদের সাথে ক্যাব’র তৃণমূল সভা অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে জীব ধারনামুলক নিরাপত্তা, কাঠামোগত নিরাপত্তা ও প্রায়োগিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *