Monday , January 21 2019
সর্বশেষ
Home / পোলট্রি / কমার্শিয়াল ব্রয়লারে কুসুমথলির পরিপূর্ন শোষনের গুরুত্ব…

কমার্শিয়াল ব্রয়লারে কুসুমথলির পরিপূর্ন শোষনের গুরুত্ব…

ডাঃ শুভ দত্তঃ মুরগীর কুসুমথলি ঈশ্বরের এক অপূর্ব সৃষ্টি। সদ্য ডিম ফুটে বেরিয়ে আসা বাচ্চার কুসুমথলির মাঝে যে সকল পুষ্টি উপাদান থাকে তা দিয়ে একটি বাচ্চা অনায়াসে ২-৩ দিন না খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারবে। বাচ্চার কুসুমথলি সাধারনত ৩-৫ দিন বাচ্চার শরীরে থাকে এবং ধীরে ধীরে এর মধ্যস্থিত উপাদানগুলো বাচ্চার শরীরে শোষিত হতে হতে অদৃশ্য হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন কারনে ৫ দিনের পরেও বা অনেক বড় বয়সে বাচ্চাতে অশোষিত কুসুমথলি দেখতে পাওয়া যায়।
 
আধুনিক বানিজ্যিক ব্রয়লারে কুসুমথলি পরিপূর্নভাবে শোষিত হবার গুরুত্ব অনেক। এটা লক্ষ্যনীয় যে, “যে সকল বাচ্চার কুসুমথলি পরিপূর্নভাবে শোষিত হয় সেগুলোর ওজন অনেক ভাল হয়। অপরদিকে যে বাচ্চাগুলোর কুসুমথলি পরিপূর্নভাবে শোষিত হয় না সেগুলোর ওজন তুলনামুলক ভাবে কম হয়।”
 
কুসুমথলি পরিপূর্নভাবে শোষিত হবার উপকারিতাঃ
১. দৈহিক বৃদ্ধিঃ কুসুমথলিতে প্রচুর পরিমানে পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকে। একটি বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় এনার্জি, লিপিড, প্রোটিন, ময়েশ্চার, ভিটামিন, মিনারেল ইত্যাদি সবকিছুই কুসুমথলিতে বিদ্যমান থাকে। সুতরাং যে বাচ্চাগুলোর কুসুমথলি ঠিকমত শোষিত হবে সেগুলো অধিক পুষ্টি পাবে এবং দৈহিক বৃদ্ধি ত্বরানিত হবে। অপরদিকে যেগুলোর কুসুমথলি ঠিকমত শোষিত হবে না সেগুলো বাচ্চা আংশিক পুষ্টি পাবে এবং দৈহিক বৃদ্ধিও তুলনামুলক কম হবে।
 
২. জীবাণু সংক্রমনঃ কুসুমথলি যেহেতু প্রচুর পুষ্টি উপাদানে ভরপুর থাকে সেহেতু এটি ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির জন্য একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। সাধারনত বাচ্চার ভেজা ও খোলা নাভীমুখ দিয়ে জীবানু কুসুমথলিতে প্রবেশ করে এবং বংশবৃদ্ধি করে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। এছাড়া দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমেও কুসুমথলিতে জীবানু প্রবেশ করতে পারে। তাই কুসুমথলি যত দ্রুত ও পরিপূর্নভাবে বাচ্চার শরীরে শোষিত হবে জীবানু সংক্রমনের সম্ভবনা তত হ্রাস পাবে। অপরদিকে কুসুমথলি যদি দেরীতে শোষিত হয় বা অপূর্নভাবে শোষিত হয় তবে জীবানু সংক্রমনের সম্ভবনা বৃদ্ধি পায়।
 
৩. ইমিউনিটিঃ কুসুমথলিতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের এন্টিবডি (এমডিএ) থাকে। যা বাচ্চা তার মায়ের শরীর থেকে পায়। এই এন্টিবডিগুলো বাচ্চাকে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধক্ষম করে তোলো যার ফলে বাচ্চা বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্ত থাকে। যে বাচ্চার কুসুমথলি যত পরিপূর্নভাবে শোষিত হবে সে বাচ্চার ম্যাটার্নাল এন্টিবডি লেভেল তত বেশী থাকবে এবং সহজে রোগাক্রান্ত হবে না। অপরদিকে যে বাচ্চার কুসুমথলি অপূর্ন বা আংশিক শোষিত হবে সে বাচ্চার ম্যাটার্নাল এন্টিবডি লেভেল তত কম থাকবে এবং সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে পরবে।
 
অনেক সময় পোস্টমর্টেম করলে বেশী বয়সের মুরগীতে কুসুমথলির অবশিষ্টাংশ দেখতে পাওয়া যায়। এটি সাধারনত কালচে বা সবুজাভ বর্নের দেখায়। এই অবস্থাকে Remnant Yolk বলে। কুসুমথলি বাচ্চার শরীরে পরিপূর্নভাবে শোষিত না হলে এমন ঘটনা দেখতে পাওয়া যায়।
 
কুসুমথলি পরিপূর্নভাবে শোষিত না হবার কারনঃ
১. তাপমাত্রাঃ তাপমাত্রা যদি সঠিক মাত্রায় না থাকে তবে মুরগীর স্বাভাবিক ফিজিওলজী বিশেষ করে ডায়জেটিভ ফিজিওলজী ব্যহত হয়। ফলস্রুতিতে কুসুমথলি পরিপূর্নভাবে শোষিত হয় না। প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বা কম তাপমাত্রায় ব্রুডিং করলে কুসুমথলি পরিপূর্নভাবে শোষিত হয় না। তাছাড়া ব্রুডিং এর সময় তাপমাত্রা উঠা-নামা করলেও কুসুমথলি ঠিকমত শোষিত হয় না। কুসুমথলি সঠিক সময়ে ও পরিপূর্নভাবে শোষিত হবার জন্য সঠিক তাপমাত্রার ভূমিকা অপরিসীম।
 
২. জীবাণু সংক্রমনঃ কুসুমথলিতে জীবানুর সংক্রমন ঘটলে কুসুমথলি ঠিকমত শোষিত হতে পারে না। সালমোনেলা, ই-কোলাই, স্ট্রেপটোক্কাস, স্ট্রেফাইলোক্কাস, ক্লোসট্রেডিয়াম, সিউডোমোনাস সহ বহু প্রজাতির গ্রাম পজেটিভ ও গ্রাম নেভেটিভ এনারোবিক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা কুসুমথলিতে সংক্রমন হতে পারে। সাধারনত বাচ্চার নাভীমুখ ও দূষিত খাদ্য-পানি দ্বারা এ সকল জীবানু বাচ্চাতে সংক্রমন ঘটায়, যা পরবর্তিতে কুসুমথলিতে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করে এবং সংক্রমন ঘটিয়ে কুসুমথলির শোষন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়।
 
৩. খাদ্য প্রদানঃ অনেকে বাচ্চা ব্রুডারে দেবার ২-৪ ঘন্টা পর বাচ্চাকে খাদ্য প্রদান করেন। বিভিন্ন গবেষণাতে দেখা গিয়েছে দেরীতে খাদ্য প্রদান করলে বাচ্চার কুসুমথলি দেরীতে শোষিত হয়। Moran এবং Rainhart নামক দুজন গবেষক লক্ষ্য করেন, যে সকল বাচ্চাকে হ্যাচিং এর পরপরই খাদ্য প্রদান করা হয় তাদের কুসুমথলি দ্রুত শোষিত হয়। অপরদিকে যে বাচ্চাগুলোকে হ্যাচিং এর পরপরই খাদ্য প্রদান না করে বেশকিছু সময় পর খাদ্য প্রদান করা হয় তাদের কুসুমথলি দেরীতে শোষিত হয়। Noy এর গবেষনায় প্রকাশ পায় হ্যাচিং এর পরপর খাদ্য প্রদান না করা বাচ্চার চেয়ে খাদ্য প্রদান করা বাচ্চার কুসুমথলি দ্রুত শোষিত হয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “হ্যাচিং এর পরপর বাচ্চা খাদ্য গ্রহন করলে অন্ত্রের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং কুসুমথলি থেকে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান অন্ত্রে প্রবেশ করে কুসুমথলির দ্রুত শোষন ঘটায়।” খাদ্য প্রদান না করা বাচ্চার অন্ত্রের সক্রিয়তা কম থাকে বিধায় কুসুমথলির উপাদান সমুহের অন্ত্রে প্রবেশের হার কম থাকে এবং কুসুমথলি ধীরে ধীরে শোষিত হয়। Santos এবং Silversides এর গবেষনায় উঠে আসে কুসুমথলির শোষন প্রক্রিয়া খাদ্যতন্ত্রের সক্রিয়তার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যে বাচ্চার খাদ্যতন্ত্র যত সক্রিয় তাদের কুসুমথলি তত দ্রুত শোষিত হয়। সুতরাং হ্যাচিং এর পরপরই খাদ্য প্রদান করে বাচ্চার খাদ্যতন্ত্রে সক্রিয়তা বৃদ্ধি করতে হবে। এ কারনেই বর্তমানে নারিশ সহ অনেক কোম্পানী বাচ্চা ডেলিভারী বক্সে কিছু খাদ্যের দানা ছিটিয়ে দিয়ে বাচ্চা
ট্রান্সপোর্ট করে। যাতে বাচ্চা হ্যাচিং এর পরপরেই খাদ্য গ্রহন করে খাদ্যতন্ত্রের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করতে পারে। এ থেকে পরিষ্কার এতোদিন ধরে অনেক খামারী ব্রুডারে বাচ্চা দেবার ২-৪ ঘন্টা পর বাচ্চাকে খাদ্য প্রদান করার যে অভ্যাস করেছেন তা সঠিক নয়।
 
৪. হ্যাচারীগত সমস্যাঃ 
ক) কুসুমথলি দেরিতে শোষিত হবার পিছনে হ্যাচারীগত কিছু কারন রয়েছে। যেমন ইনকিউবেশন পিরিয়ডে যদি কম তাপমাত্রা ও অধিক আদ্রর্তা প্রদান করা হয় তবে ডিম থেকে কম ময়েশ্চার বের হয়। ফলে এই ডিম থেকে যে বাচ্চা বের হয় তার কুসুমথলি অনেক বড় থাকে। তাছাড়া ডিম যদি হ্যাচারে অধিক সময় রাখা হয় তবেও বাচ্চার কুসুমথলি আকারে বড় হতে পারে। এই ধরনের বাচ্চার কুসুমথলি শোষিত হতে বেশী সময় লাগে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে অশোষিত বা আংশিক শোষিত অবস্থায় থেকে যায়।
খ) ব্রিডার বা হ্যাচারীতে যদি পর্যাপ্ত হাইজিন মেনে না চলে তবে বাচ্চা বিভিন্ন জীবানু দ্বারা সংক্রমিত হয়। এই ধরনের বাচ্চার কুসুমথলি পূর্ব থেকেই সংক্রমিত থাকে যার ফলে এই বাচ্চা গুলোর কুসুমথলি পূর্নভাবে শোষিত হতে পারে না এবং শরীরে আংশিকভাবে রয়ে যায়।
 
কুসুমথলি দ্রুত ও পরিপূর্নভাবে শোষনের জন্য করনীয়ঃ
১. সঠিক মাত্রায় তাপ প্রদান করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন ব্রুডারের তাপমাত্রা উঠা-নামা না করে। তাপমাত্রার উঠা-নামায় বাচ্চাতে ধকল পরে, ফলস্রুতিতে কুসুমথলি অশোষিত রয়ে যায়।
 
২. পরিষ্কার ও জীবানুমুক্ত তুষের উপর ব্রুডিং করতে হবে। এবং জীবানুমুক্ত খাদ্য ও পানি প্রদান করতে হবে। পত্রিকার উপর খাবার ছিটিয়ে না দেয়াটাই উত্তম।
 
৩. বাচ্চাকে অভুক্ত রাখা যাবে না। বাচ্চা ব্রুডারে দেবার আগেই ব্রুডারে খাদ্য ও পানি দিয়ে রাখতে হবে যেন বাচ্চা ব্রুডারে গিয়েই তার প্রয়োজনমত খাদ্য খেতে পারে।
 
লেখক পরিচিতিঃ
ডাঃ শুভ দত্ত
ডিভিএম (সিকৃবি), এমএস ফেলো ইন ফার্মাকোলজি (সিকৃবি)
সিএসও (নারিশ পোল্ট্রি এন্ড হ্যাচারী লিমিটেড)

About Editor

Check Also

বাবুগঞ্জে সরিষার বাম্পার ফলন, লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে ফসলের মাঠজুড়ে এখন হলুদ হাসি

আব্দুল্লাহ মামুন, বাবুগঞ্জ থেকেঃ চলতি রবি মৌসুমে বাবুগঞ্জে ব্যাপক পরিমাণ সরিষার আবাদ হয়েছে। সরিষা চাষ প্রচুর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *