Monday , January 21 2019
সর্বশেষ
Home / প্রথম পাতা / যমযম ডেইরী ফার্মের সফলতার পেছনের গল্প…

যমযম ডেইরী ফার্মের সফলতার পেছনের গল্প…

অনিক আহমেদ: মো: মনসুর রহমান – পেশায় একজন শিক্ষক; নাটোর সদর উপজেলার বাকশোর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। আর দশ জন মানুষের মতই তিনি একজন মানুষ, তবে একজন সফল মানুষ। কারণ, তিনি নিজ প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন একটি ডেইরী ফার্ম যার নাম “যমযম ডেইরী ফার্ম”। পুরো নাটোর জেলায় যেটা একনামে পরিচিত এবং আশেপাশের জেলাগুলোতেও সমানভাবে পরিচিত। তবে একদিনে গড়ে উঠেনি ফার্মটি, অনেক কাঠখড় পেড়িয়ে আজকের এই অবস্থানে।

পাঠক, চলুন তাহলে শুনে আসি মো: মনসুর রহমানের “যমযম ডেইরী ফার্ম” এর সফলতার ইতিবৃত্ত।

প্রায় ১২ বছর আগের কথা। দুধ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে মাত্র ২ টি হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান জাতের গরু নিয়ে খামার শুরু করেছিলেন নাটোর সদর উপজেলার দীঘাপতিয়ার মো: মনসুর রহমান। শুরুর পথটা অতটা সহজ ছিল না। পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে শুরুতে তিনি ছিলেন অসফল। যার কারণে ফার্ম শুরুর বছর দুয়েকের মাঝেই মারা যায় তাদের ৩/৪ টি গাভী। কিন্তু থেমে থাকেনি তার পথচলা বরং দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে পর্যাপ্ত সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করে এগোতে থাকেন। মেধার সঠিক ব্যবহার আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আস্তে আস্তে সফলতার মুখ দেখেন মো: মনসুর রহমান। বর্তমানে তার খামারে মোট ৪৪টি গরু রয়েছে যার মধ্যে ২৪ টি দুধ দেয়া গাভী।

প্রতিদিন মনসুর মিয়ার খামার থেকে গড়ে দুই বেলা ২৫০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। দুধ বিক্রি করে তিনি প্রতিদিন নয় হাজার টাকা উপার্জন করছেন। দুধ দোহনের জন্য তিনি মেশিন ব্যবহার করেন যার ফলে কম সময়ে সহজে বেশী পরিমাণ দুধ উৎপাদন নিশ্চিত হয় এবং এতে গরুর কষ্টও কম হয়। দুধ দোহনের মেশিনটি সুইজারল্যান্ড থেকে আনা যা তিনি ৮৬ হাজার টাকায় ক্রয় করেন।

খামারে পর্যাপ্ত খাবারের যোগান দিতে পাশেই ৭/৮ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন থাইল্যান্ডের পাকচং ঘাস যা আসলে নেপিয়ারের ক্রস। এছাড়া তিনি বিভিন্ন দানাদার খাদ্য যেমন গমের ভূষি, খেসারি ভাঙ্গা, খৈলসহ প্রয়োজনীয় সকল খাদ্য দিয়ে থাকেন। তবে তিনি গরুকে কাচাঘাসই বেশী খাওয়ান। কারণ হিসেবে তিনি জানান, “প্রচুর পরিমাণে কাচাঘাস খাওয়ানোর ফলে দুধ উৎপাদন অনেক বেশী হয়, রোগব্যাধি কম হয় এবং বীজ কনসিভ করার হার বাড়ে।” একারণে তিনি তার খামারে খড় খাওয়ান না বললেই চলে। প্রতিদিন গড়ে একটি গাভী ৬-৭ কেজি খাবার খেয়ে থাকে। খামারের গরুগুলোর রোগব্যাধি খুব কম হয় যা তার লাভবান হওয়ার অন্যতম একটি কারণ।

মনসুর রহমানের খামারের বেশ কিছু লক্ষ্যনীয় বিষয় রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হল তার খামারের গরু মাত্র দশ মাস বয়স হলেই বীজ কনসিভ করে। স্থানীয় পশু ডাক্তাররা এটাকে বিরল একটি ঘটনা বলে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশে হাতে গোণা মাত্র ২/১ একটি খামারে এমন ঘটনা ঘটে। তাছাড়া, প্রথমবার বাচ্চা প্রসবের পরই গাভীগুলো ২০ কেজির উপরে দুধ দিয়ে থাকে এবং বাচ্চা প্রসবের ২ মাস পরই বীজ দিলে একবারেই কনসিভ করে। খামারের গরুগুলো বয়স অনুযায়ী অনেক বেশী স্বাস্থ্যবান।

যমযম ডেইরী ফার্মে প্রবেশপথেই রয়েছে জীবাণুনাশক যা বাইরের জীবাণুকে ভেতরে প্রবেশে বাধা দেয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানির যোগান দিতে প্রতিটি গরুর ম্যাঞ্জারে (খাবার যেখানে দেয়া হয়) পানির ট্যাপের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটা ম্যাঞ্জারের নিচে আরেকটা ট্যাপ রয়েছে যেটা দিয়ে অপ্রয়োজনীয় পানি এবং তরল দ্রব্য নিষ্কাশন করা হয়। বাংলাদেশের ডেইরী ফার্মগুলোতে এ ধরণের ব্যবস্থা সাধারণত দেখা যায় না। নিচে কার্পেটের ব্যবস্থা করা আছে যার মাধ্যমে বর্জ্য পর্দাথসমূহকে সহজেই পানি দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করা হয়।

মনসুর রহমান খামারের গোবর দিয়ে নির্মাণ করেছেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। এ প্ল্যান্টের মাধ্যমে বাড়ির রান্নাবান্না করা হয়। এছাড়া গোবর সার জমিতে ব্যবহার করে তিনি অধিক পরিমাণ ফসল উৎপন্ন করছেন।

মনসুর রহমান তার ছেলেকে রাজধানী ঢাকার সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি বিষয়ে পড়াশোনা করাচ্ছেন। তার ইচ্ছা, প্রতিযোগিতামূলক এই যুগে চাকরি নামক সোনার হরিণের পিছনে যেন তার ছেলেকে ঘুরতে না হয়। তার ছেলে যেন এলাকায় থেকে এই ফার্মের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, এমনটাই আশা মনসুর রহমানের।

আমাদের কথা হয় মনসুর রহমানের ছেলে মশিউর রহমানের সঙ্গে। তিনি ফার্ম নিয়ে এগ্রিভিউ টোয়েন্টিফোরকে জানান, “আমাদের ফার্মটি এখন খুবই ভাল অবস্থানে আছে। ফার্মের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আমরা শীঘ্রই সিসি টিভির ব্যবস্থা করবো এবং পড়াশোনা শেষ করে আমি ফার্মটিকে আরো বড় পরিসরে করতে চাই।”

দুধ বিক্রির বিষয়ে অভিযোগ করে মশিউর রহমান জানান, “আমরা দুধের পর্যাপ্ত মূল্য পাচ্ছি না। আগে মিল্ক ভিটা ছিল যার মাধ্যমে আমরা নায্যমূল্য পেতাম। কিন্তু এখন মিল্ক ভিটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ঘোষরা সিন্ডিকেট তৈরী করে যার ফলে অনেক কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় দানাদার খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়। এজন্য সাম্প্রতিককালে আমরা শহরে দুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি। আশা করছি, এর মাধ্যমে আমরা দুধের নায্যমূল্য পাবো।”

যমযম ডেইরী ফার্মের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ফার্মটি যথাসম্ভব অাধুনিক প্রযুক্তির আওতাভুক্ত। দুধ দোহনের জন্য রয়েছে যেমন মেশিন তেমনি ঘাস কাটার জন্যও ৩৭ হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করা হয়েছে গ্রাস চপিং মেশিন। এছাড়াও রয়েছে আরো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছোয়া। এজন্য শুধু বড় বড় ফার্ম করলেই হবে না, লাভবান হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি ফার্মকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে। খামারের দেখাশোনার ৫ জন শ্রমিক নিয়োজিত আছেন। তারা খামারের সার্বিক দেখভাল করে থাকেন।

প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসেন যমযম ডেইরী ফার্ম পরিদর্শনের জন্য। নতুন খামার করতে আগ্রহীদের যাবতীয় পরামর্শও দিয়ে থাকেন মনসুর রহমান।

প্রাণীজ আমিষ দুধের অভাব পূরণ এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাকরণে যমযম ডেইরী ফার্ম এককথায় অসাধারণ। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হয়েও ডেইরী ফার্ম করে মনসুর রহমান যে সফলতা দেখিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। বাংলাদেশের প্রান্তিক খামারীদের জন্য মনসুর রহমান একজন মডেল। আগামীতে মনসুর রহমানের দেখাদেখি হাজারো মানুষ ডেইরী ফার্ম গঠনে মনোযোগী হবে, দুর হবে বেকারত্ব, পূরণ হবে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি, এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ এমনটাই আশা সর্বসাধারণের।

About Editor

Check Also

বাবুগঞ্জে সরিষার বাম্পার ফলন, লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে ফসলের মাঠজুড়ে এখন হলুদ হাসি

আব্দুল্লাহ মামুন, বাবুগঞ্জ থেকেঃ চলতি রবি মৌসুমে বাবুগঞ্জে ব্যাপক পরিমাণ সরিষার আবাদ হয়েছে। সরিষা চাষ প্রচুর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *