Monday , January 21 2019
সর্বশেষ
Home / পোলট্রি / মুরগির ইনফেকশাস করাইজা রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা

মুরগির ইনফেকশাস করাইজা রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা

মোরগ-মুরগীর ব্যাকটেরিয়াজনিত একটি তীব্র সংক্রামক রোগ। হিমোফিলাস প্যারাগ্যালিনেরাম (Haemophilus paragallinarum) ব্যাকটেরিয়া এ রোগের কারণ। এটি মোরগ মুরগির শ্বাসতন্ত্রের একটি মারাত্মক রোগ। নাসারন্ধ্র প্রদাহ ও সাইনাস প্রদাহ ঘটিত উপসর্গ এ রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। নাসারন্ধ্র প্রদাহের ফলে নাসিকা থেকে পানির ন্যায় তরল পদার্থ নি:সৃত হয়। সাইনাস প্রদাহের ফলে মোরগ-মুরগীর মুখ ও মাথা ফুলে যায়। এই রোগে আক্রান্ত হলে চোখে প্রদাহ হয় এবং কনজাংটিভাইটিস দেখা দেয় এবং চোখ দিয়ে পানি পড়ে। পৃথিবীব্যাপি এ রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। মোরগ-মুরগী, কোয়েল ও ফিজ্যান্ট এ রোগে আক্রান্ত হয়। আমেরিকায় পুলেট, লেয়ার ও কোনো কোনো ব্রয়লারে এ রোগ দেখা যায়। সকল ধরনের মোরগ-মুরগী এ রোগে আক্রান্ত হয় কিন্তু বড় মুরগি অপেক্ষাকৃত বেশি আক্রান্ত হয়। পাঁচ দিন বয়স পর্যন্ত মুরগির বাচ্চা এ রোগে আক্রান্ত হয় না। এ রোগে আক্রান্তের হার বেশি কিন্তু মৃত্যুর হার কম। এ রোগে আক্রান্ত মুরগি সুস্থ হলে বাহক হিসেবে অন্যান্য সুস্থ মুরগিতে প্রায় বছর ধরে রোগ ছড়াতে পারে।

রোগের কারণঃ
হেমোফিলাস প্যারাগ্যালিনেরাম নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ইনফেকশাস করাইজা সংক্রমিত হয়। এই ব্যাকটেরিয়া গ্রাম নেগেটিভ, বাই-পোলার, এরোবিক, নন-স্পোর ফরমিং, ক্যাটালেস নেগেটিভ, নন-মোটাইল ও রডের আকৃতির হয়। এই ব্যাকটেরিয়ার এন্টিজেনিক টাইপ আছে। এই টাইপগুলো হলো A, B ও C । হেমোফিলাস প্যারাগ্যালেনেরাম ব্যাকটেরিয়া তাপ ও যে কোনো জীবাণুনাশক দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পোষকের শরীর ছাড়া ২-৩ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক পরিবেশে মারা যায়।

রোগের বিস্তার পদ্ধতিঃ

  • অসুস্থ মোরগ-মুরগী থেকে নাকের শ্লে­ষ্মার মাধ্যমে সুস্থ মোরগ-মুরগীতে রোগ ছড়ায়
  • সরাসরি সংস্পর্শ দূষিত বাতাস, খাদ্য ও পানির মাধ্যমে ইনফেকশাস করাইজা রোগ ছড়ায়।
  • রোগাক্রান্ত ও বাহক মোরগ-মুরগী থেকে এ রোগ ছড়াতে থাকে।
  • বাচ্চা মুরগি থেকে বয়স্ক মুরগিতে এ রোগের তীব্রতা বেশি।
  • অপরিষ্কার ঘর, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পরজীবীর সংক্রমণ, পুষ্টির অভাব, ইত্যাদি কারণে এ রোগের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়।

রোগের লক্ষণঃ

  • এই রোগে আক্রান্ত মুরগির নাসারন্ধ্র ও সাইনাসে (Sinus) প্রদাহ হয়।
  • প্রদাহের ফলে নাসিকা থেকে প্রথমে পানির ন্যায় তরল পদার্থ নিঃসৃত হয় পরে রক্ত মিশ্রিত শ্লে­ষ্মা নিঃসৃত হয়।
  • সাইনাস প্রদাহের ফলে মুখমন্ডল ফুলে যায়।
  • অক্ষি ঝিল্লি­তে প্রদাহ হয়, চোখ দিয়ে পানি পড়ে, চোখের পাতা আটকে যায়।
  • শ্বাসতন্ত্র আক্রান্ত হওয়ার পর শ্বাসকষ্ট ও ঘড়ঘড় শব্দ হয়।
  • গলকম্বল বিবর্ণ হয়ে যায় ও পানি জমে।
  • ডিমপাড়া মুরগীর ডিম পাড়ায় হার শতকরা ১০ থেকে ৪০ ভাগ কমতে পারে।
  • এই রোগে বড় মুরগি, ছোট মুরগির চেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়।
  • এই রোগে আক্রান্তের হার বেশি কিন্তু মৃত্যুর হার কম।

ময়না তদন্তঃ

  • নাসারন্ধ্র ও সাইনাসে ক্যাটারেল ইনফ্লামেশন দেখা যাবে।
  • কনজাংটাইভা ও সাইনাসে ক্যাজিয়াস মাস (Caseous Mass) পাওয়া যাবে।
  • ফুসফুসে নিউমোনিয়া এবং ব্রংকাইতে প্রদাহ দেখা যাবে।
  • ইনফ্রাওরবিটাল সাইনাস (Infraorbital sinus) ফোলা থাকবে এবং রসে (Exudate) পূর্ণ থাকবে।
  • চোখের পাতা ফোলা থাকবে এবং কনজাংটাইভাল স্যাকে (Conjunctival sac) সাদা রস জমা থাকবে।
  • কোনো কোনো সময় রোগাক্রান্ত মোরগ-মুরগীর মুখমন্ডল ও গলকম্বলে পানি জমা থাকবে।

রোগ নির্ণয়ঃ
সাময়িকভাবে রোগ নির্ণয়ঃ
রোগের ইতিহাস, রোগ লক্ষণ ও অতি দ্রুত রোগ বিস্তার, আক্রান্তের চেয়ে মৃত্যুর হার কম এবং ছোট মুরগির চেয়ে বড় মুরগি আক্রান্তের হার বেশি দেখে সাময়িকভাবে ইনফেকশাস করাইজা রোগ নির্ণয় করা যায়।

নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করতে হলে নিন্মলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবেঃ
ক) আক্রান্ত মুরগির সাইনাসের রস নিয়ে স্মেয়ার (Smear) করতে হবে। স্মেয়ার করলে গ্রাম নেগেটিভ, বাইপোলার, রড আকৃতির ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যাবে।
খ) সাইনাস রস থেকে পৃথক করে ব্যাকটেরিয়া সনাক্ত করতে হবে।
গ) মিডিয়া কালচার এবং মুরগিতে ইনফেকশাস করাইজা রোগের জীবাণু ইনোকুলেশন (Inoculation) করে রোগ সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় ।
ঘ) পিসিআর (PCR) এর মাধ্যমে হেমোফিল্যাস প্যারাগ্যালিনেরাম ব্যাকটেরিয়া সনাক্ত করে রোগ নির্ণয় করা যায়।
ঙ) সিরোলজিক্যাল টেস্ট যেমন হিমাগ্লুটিনেশন (HA), হিমাগ্লুটিনেশন ইনহিবিশন (HI), এবং ইমিউনো ডিফিউশন (ID) টেস্ট করে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা যায়।

প্রতিরোধঃ
ক) ইনফেকশাস করাইজা রোগ ছোঁয়াচে সেহেতু সুস্থ মুরগিকে রোগাক্রান্ত মুরগি এবং বাহক মুরগি থেকে পৃথক করে ফেলতে হবে।
খ) মুরগিকে পরিষ্কার খাদ্য ও পানি সরবরাহ করতে হবে।
গ) মুরগির ঘর পরিষ্কার রাখতে হবে এবং খামারে কার্যকর জীবাণুনাশক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।
ঘ) অল ইন অল আউট (All in all out) নিয়ম মেনে চলতে হবে।
ঙ) জীবনিরাপত্তার অন্যান্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
চ) আক্রান্ত খামার কয়েকদিন পরিত্যক্ত রাখতে হবে। পরে জীবাণুনাশক স্প্রে করে নতুন মুরগির বাচ্চাকে প্রবেশ করাতে হবে।
ছ) এ রোগ প্রতিরোধের জন্য ৬-৮ সপ্তাহ বয়সে প্রথম বার এবং ১৬ সপ্তাহ বয়সে দ্বিতীয় বার চামড়ার নিচে ইনএকটিভেটেড ভ্যাকসিন ব্যবহার করতে হবে।

সূত্রঃ পোল্ট্রি পালন ও চিকিৎসাবিদ্যা – প্রফেসর ড. মো. আব্দুস সামাদ

About Editor

Check Also

বাবুগঞ্জে সরিষার বাম্পার ফলন, লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে ফসলের মাঠজুড়ে এখন হলুদ হাসি

আব্দুল্লাহ মামুন, বাবুগঞ্জ থেকেঃ চলতি রবি মৌসুমে বাবুগঞ্জে ব্যাপক পরিমাণ সরিষার আবাদ হয়েছে। সরিষা চাষ প্রচুর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *