Wednesday , November 21 2018
সর্বশেষ
Home / ক্যাম্পাস / সিসভেক থেকে সিকৃবি; এরপর যেমন গেলো এক যুগ…

সিসভেক থেকে সিকৃবি; এরপর যেমন গেলো এক যুগ…

১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সিলেট সরকারী ভেটেরিনারি কলেজ যখন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় তখন কলেজ হিসেবে  এক যুগ অতিবাহিত করেছিল । আজকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এক যুগ অতিক্রম করছে প্রিয় সিকৃবি । দিন তারিখ ঠিক মনে নেই, সিলেটে সেবারই প্রথম আমার যাওয়া, উদ্দেশ্য ভর্তি পরীক্ষা । ঝক ঝকা ঝক “পারাবত এক্সপ্রেস” চলেছে সিলেট অভিমুখে, বাবাকে সাথে নিয়ে আমি যাচ্ছি ভর্তি পরীক্ষা দিতে । শ্রীমঙ্গল পার হতেই এক পশলা বৃষ্টি, কিছুদূর যেতে উধাও । আনুমানিক ২ টার দিকে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে পৌছলাম । টিলাগরে অবস্থিত সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার জন্য রিক্সা ভাড়া করছি; এই নামটা শুনে কিছু চালক এমন একটা ভাব নিলো যেন আকাশ থেকে পড়ছে (কারনটা অবশ্য পরে বুঝতে পেরেছি), ২/১ জন আবার যেতেও চাইলো । রিক্সা চেপে চলতে লাগলাম সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিমুখে, কি সুন্দর একটা শহর সিলেট, নিরিবিলি ও গোছানো । টিলাগরে অবস্থিত এমসি কলেজের সামনে রিক্সাচালক  আমাদের নামায়ে দিয়ে বলল এটাই সেই জায়গা যেখানে আপনারা আসতে চাইছিলেন । ফটকের সামনে লেখা সিলেট এমসি কলেজ আর এই ব্যাটা বলে এটাই নাকি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় । কয়েকজনকেই জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছে না এই বিশ্ববিদ্যালয় টা কোথায়, কেউ কেউ তো বলেই দিল এই নামে ভার্সিটি নাই সিলেটে, শাহজালাল ভার্সিটি আছে একটা । যাই হোক অনেক জিজ্ঞাসা করে বালুচর পয়েন্ট পর্যন্ত আসলাম, সেখানে এসেও চোখে মুখে অন্ধকার । এক লোক পরে বলল যে এখানে ভেটেরিনারি কলেজ আছে, সেটা বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে কিনা জানা নাই, আপনারা এই রাস্তা (মাদানীবাগের রাস্তা) দিয়ে ভিতরে যেয়ে দেখতে পারেন । এই রাস্তা দিয়ে যতই এগুচ্ছি ততই মুগ্ধতা আমাকে গ্রাস করছিল, দু পাশে টিলা, বৃষ্টিতে গোসল করে যেন নবযৌবন ধারন করেছে, সামনে এগুতে এগুতে খুঁজে পেলাম সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; সেই থেকেই শুরু…

 

২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল, ছয়টি বছর সিকৃবিতে (ভাববেন না ইয়ার ড্রপ, সেশন জটের কারনে ১ বছর বেশি লেগেছিল) । ক্যাম্পাস ছাড়লেও সিকৃবির খবরাখবর নিয়মিত পেতাম, প্রকাশ করতাম এগ্রিভিউ তে, অফিসের কাজে সিলেট যেয়ে মাঝে মধ্যে আড্ডা মারতাম জুনিয়রদের সাথে । বিশ্ববিদ্যালয় হবার পর সিকৃবির দৃশ্যমান অগ্রগতি ২০১৫ সাল পর্যন্ত খুব একটা চোখে পরে নাই, এত বেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত যে অনেকের মুখেই শুনেছি “সিলেট কালচারাল বিশ্ববিদ্যালয়” নামটা । সময় বদলেছে, সিকৃবি নামক চাড়া গাছটি শাখা প্রশাখা মেলে ধরা শুরু করেছে । বিভিন্ন আড্ডায় প্রায়ই বুক ফুলিয়ে বলি আমার ক্যাম্পাসে ইউজিসি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া শিক্ষক আছেন । যখন দেখি সিকৃবির কোন শিক্ষক অন্য দেশে যেয়ে কোন সম্মাননা পাচ্ছেন তখন অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করে (এই ব্যাপারগুলা ২০১৫ সালের পরই বেশি দেখা যাচ্ছে)। সিকৃবির ইতিহাসে প্রথম সমাবর্তন হয়ে গেল এই বছর, এটাও সাফল্যের কাতারেই আমি রাখতে চাই ।

 

আমার ক্যাম্পাসের একটি মেয়ে যখন বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডার পায় তখন বোঝা যায় যে আমরা আসলেই কতটা এগিয়েছি । এলাহী স্যার যখন পিএইচডির জন্য ভালো স্কলারশীপ অফার করে সার্কুলার দেয় তখন বুঝা যায় গবেষনা ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রযাত্রা । ছোট ভাই লিটন যখন স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যায় কিংবা বন্ধুসুলভ বড় ভাই শাফিন যখন অস্ট্রেলিয়াতে যেয়ে বিশাল কিছু একটা করে ফেলে তখন বিশ্বাস করি আমাদের সফলতায় । একটা সময় তো দেখতাম সিকৃবির সবাই স্কলারশীপ নিয়ে কোরিয়া যেত, গত কয়েকবছর ধরেই তো দেখছি বিশ্বের নামকরা সব স্কলারশীপ নিয়ে ক্যাম্পাসের বহু ছাত্র ছাত্রী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে, প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে । তবে সত্যি বলছি এত এত সফলতার গল্প লেখার আগে মনকে এটাও বুঝ দেবার চেষ্টা করি যে, সরকারী বেসরকারি চাকুরী ক্ষেত্রে সফলতার জন্য ক্যাম্পাস কতটুকু শীক্ষার্থীবান্ধব ? ক্যাম্পাস কতটুকু সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে একটু বিসিএস পড়ার, উত্তর খুঁজে হয়ত সামনে প্রকাশ করবো ।

আরেকটি জিনিস সত্যিই খুব ভালো লাগে । এখন আগের থেকে রেজাল্ট ভালো হচ্ছে, ক্যারি খাওয়া কিংবা ইয়ার ড্রপের সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে । ফার্স্ট ইয়ার একটি শিক্ষার্থীর জন্য আসলেই খুব দুঃসহ থাকে, একদম নতুন পড়া, খাপ খাওয়ানো টা খুব চ্যালেঞ্জের হয়ে থাকে । ১৩ তম ব্যাচে আমরা  ভর্তি হয়েছিলাম ৭৫ জন, সেকেন্ড টাইম ট্রাই করার সংখ্যা বাদ দিয়ে সম্ভবত ৬৩ জন ১০১ এ পরীক্ষা দিয়েছিলাম, প্রায় ৪২ শতাংশ (২৬ জন) শিক্ষার্থী ফেল করলাম এনাটমি তে; ১০১ এ জিপিএ পেলাম ৩.৫৩ কিন্তু এনাটমি তে ফেল । আমাদের ব্যাচের প্রায় ২০ জনের মত ইয়ার ড্রপ গেল । ফোর ক্রেডিট বাইন্ডিং কিংবা ৫ কোর্স বাইন্ডিং নিয়ে আন্দোলন তো নিজ চোখেই দেখেছি, টার্মিনেশন ঠেকাতে কয়েকজনের বাবা মা কে এসে বিভিন্ন চেম্বারে যেয়ে কান্নাকাটিও করতে দেখেছিলাম । এখন অবশ্য এই অবস্থা থেকে অনেকটাই দূর হয়েছে, রেজাল্টও ভালো হচ্ছে ।

অনেকগুলা টিলা ছিল ক্যাম্পাসে, আমি ক্যাম্পাসে এসে প্রথম যে টিলাতে আমার বাবাসহ উঠেছিলাম সেই টিলার উপরের আজ দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু হলটি । অনেক অনেক স্থাপনা তৈরী হয়েছে, ইঞ্জিনিয়ারিং এর ভবন টা তো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দেখা সেরা ভবন মনে হয় । শহীদ মিনার টাও অসম্ভব সুন্দর করে তৈরী করা ।

১২ বছরে সিকৃবির অর্জন কি এই টাইপের প্রশ্ন কেউ আমাকে করলে আমি এক বাক্যে বলবো যে নিজেদের ক্যাম্পাসের একজন ভিসি পাওয়া । গত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তে আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম যে, “জন্মদিনে একটাই চাওয়া যে ক্যাম্পাসের কোন একজন শিক্ষক যেন আগামীতে ভিসি হন” আমার সেই চাওয়া টা এবার পূরন হয়েছে । বাকৃবিতে দেখতাম ক্যাম্পাসের কোন ডিপার্টমেন্টের কেউ একজন ভিসি হচ্ছেন, মেয়াদ পূর্ন করে তিনি আবার সেই ডিপার্টমেন্টেই ফেরত যাচ্ছেন, ফলে জবাবদিহিতার একটা তাড়না থাকাটাই স্বাভাবিক । মতিউর রহমান হাওলাদার স্যারের ভিসি হবার মাধ্যোমে আমার অনেক দিনের একটি ইচ্ছে এবার পূরন হলো ।

ভিসি স্যারের কাছে আমার নিজের একটি চাওয়া আছে, আর সেটা হলো সিকৃবির ক্লিনিক্স । বাকৃবি, সিভাসু এরা শুধু ক্লিনিক্স করেই বসে থাকেনি, এখানে যেসব রোগী আসে, যেসব অপারেশন হয় তা সত্যিই অবাক করে । শুধু তাই নয়, পবিপ্রবির বাবুগঞ্জ ক্যাম্পাসে যে পরিমান রোগী আসে এবং যেসব কাজ করা হয় তা আসলেই অসাধারন । সে তুলনায় আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি । প্রতিটা ক্যাম্পাসই এখন ক্লিনিক্স এ জোর দিচ্ছে, তার সর্বশেষ উদাহরন হচ্ছে বশেমুরকৃবি ।

 

কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন সিকৃবির কাছে কি চান এবারের জন্মদিনে তাহলে আমি এবার নিজেকে নিয়েই চাইবো –  বৃষ্টিতে ভিজে সিকৃবির সেই মাঠে আরেকটা বার ফুটবল খেলতে চাই, আরেকটা বার গোল কিপিং করতে চাই ।

 

ভালু থাকুক প্রিয় সিকৃবি; শুভ জন্মদিন…

 

 

খালিদ হোসাইন
সাবেক শিক্ষার্থী
ভেটেরিনারি এন্ড এনিম্যাল সায়েন্স অনুষদ
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

About Editor

Check Also

ডেইরী শিল্পে সফলতার অপর নাম “কৃষিবিদ ডেইরী ফার্ম”

অনিক অাহমেদ, সাভার, ঢাকা: দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের প্রাণিজ অামিষের চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *