Monday , November 19 2018
সর্বশেষ
Home / ক্যাম্পাস / বার বছরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বার বছরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

কৃষি নিয়ে সম্ভাবনার যে বড় বড় স্বপ্নগুলো তৈরি হয়েছিল, ১২ বছর পর তা সাফল্য হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থাকে উন্নত করতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সিলেটের লালচে মাটির গুণগতমান দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্নতর। আবার বৃহত্তর সিলেটে রয়েছে হাজার হাজার একর অনাবাদি উঁচু-নিচু পাহাড়ি অসমতল ভূমি। আছে হাওর নামের বিস্তীর্ণ জলাশয়। অপার সম্ভাবনাময় এসব প্রাকৃতিক সম্পদসমূহকে গবেষণার মাধ্যমে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার জন্য ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো ক্যাম্পাসটি। ইতোমধ্যে ৬টি অনুষদ সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সিলেট সরকারী ভেটেরিনারি কলেজের ৫০ একর জায়গায় শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম। এক যুগ পরও টিলাঘেরা এই সবুজ মৃত্তিকার উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

ষোল কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে একটা মানুষও না খেয়ে নেই। দাম যেমন-তেমন, তবে এখন আর দুর্ভিক্ষ হয় না। দেশি মাছ হারিয়ে গেলেও হাইব্রিড মাছ পাওয়া যাচ্ছে দেদারসে। মেহমান এলে সাধের পালিত মুরগী উঠোন থেকে ধরে এনে জবাই করতে হয় না। অল্প টাকায় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে পোল্ট্রি। যে ক্ষেতে আগে ১ টন ধান ফলন হতো, এখন সেখানে ফলছে ৫-৬ টন। আর এর সবই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের কারণে। প্রতিবছর এরকম বহু কৃষি বিজ্ঞানী তৈরি করে সারা বাংলাদেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

এখন পর্যন্ত সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদ এবং মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ থেকে গ্র্যাজুয়েট হিসেবে ৭টি করে ১৪টি ব্যাচ বের হয়েছে। এদিকে ভেটেরিনারি, এনিম্যাল অ্যান্ড বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সস অনুষদ থেকে ইতোমধ্যে ১৯টি ব্যাচ বেরিয়ে গেছে। সম্প্রতি কৃষি অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ থেকে বের হয়েছে পাঁচটি ব্যাচ এবং কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ থেকে আরও তিনটি ব্যাচ। বিসিএস পরীক্ষাসহ দেশে-বিদেশে আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের ছড়াছড়ি। ভাবতে ভালই লাগছে, এরা সবাই এখন স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করে আছে এবং বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাদের একাডেমিক জ্ঞানটুকু এবার মাঠে কাজে লাগবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধুর সম্পর্কের কারণেই তারা সফল হয়েছে।

এটা সত্য যে ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো খবর কম। তবু কয়েকটা কথা শেয়ার না করলেই নয়। সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় হাওরে জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন এখানকার গবেষকরা। হাওরে বছরে ৭/৮ মাস চারদিকে থৈ থৈ পানি দিয়ে ভরা। শুধুমাত্র বসতভিটার উঁচু জায়গাটুকুই দ্বীপের মত ভাসমান। সিকৃবির প্রচেষ্টায় সেখানে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা। বোরো ফসল নির্ভর হাওরাঞ্চলে এক সময় শীতকালেও মাঠের পর মাঠ পতিত থাকত। ২০১৫ সাল থেকে সুনামগঞ্জের দেখার হাওরসহ বিভিন্ন হাওরের প্রান্তিক কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সিকৃবি নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে। সিকৃবির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহায়তায় কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ) এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে খরিপ ও রবি মৌসুমে লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রান্তিক জনপদের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রকল্পের প্রধান গবেষক প্রফেসর ড. মো. আবুল কাশেম, প্রফেসর ড. মো. আবু বকর সিদ্দিক, প্রফেসর ড. মো. শহীদুল ইসলাম, প্রফেসর ড. জসিম উদ্দিন আহাম্মদ. পিএইচডি ফেলো সহযোগী প্রফেসর মো. আব্দুল আজিজ, গবেষণা সহযোগী মান্না সালওয়াসহ অন্যান্য গবেষকদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে লাগসই ধান চাষ, সবজি চাষ, মাছ চাষ, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগী পালন, কবুতর পালনসহ নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সিকৃবির আরেকটি গবেষণা একেবারে চোখে পড়ার মতো। টমেটো বা শিম এখন আর শুধুমাত্র শীতকালে চাষ হবে না। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. শহীদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে শিমের গ্রীষ্মকালীন নতুন দুটি জাত অনুমোদন পেয়েছে। প্রোটিন সমৃদ্ধ এই জাতগুলোর তিনি নাম দিয়েছেন সিকৃবি শিম-১ ও সিকৃবি শিম-২। এই জাত সিলেট অঞ্চলে বছরব্যাপী ধরে প্রোটিনের চাহিদা মেটাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সিলেট অঞ্চলের কৃষি আবহাওয়া সম্পর্কিত তথ্য জানার জন্য প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয়েছে অটোমেটেড এগ্রোমেটিওরোলজিক্যাল স্টেশন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি) কৃষি বনায়ন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার ল্যাবের তত্ত্বাবধানে এই অত্যাধুনিক এগ্রোমেটিওরোলজিক্যাল স্টেশনটি চালু করা হয়েছে। এগ্রোমেটিওরোলজিক্যাল স্টেশনটি বিশ্বব্যাংক, ইউএসএইড ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্প-২(৪৩৯) এর আওতায় কৃষি অনুষদ ভবনের পূর্ব পাশে কৃষি বনায়ন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের নার্সারিতে স্থাপন করা হয়েছে। স্টেশনটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডাটা লগারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। যাতে প্রতিনিয়ত নিরবচ্ছিন্নভাবে বায়ুর তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মৃত্তিকার তাপমাত্রা, মৃত্তিকার ইলেট্রিকাল কনডাকটিভিটি ও পারমিটিভিটি এবং তাপমাত্রার টাইম সিরিজ ডাটা সংরক্ষণ হতে থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী কম্পিউটারের সাহায্যে ডাটা লগার থেকে সংরক্ষিত ডাটা কাজে লাগানো যাবে।

 

এত প্রাপ্তির মাঝেও কিছু না পাওয়ার কথা রয়ে গেছে। যেমন, ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য অধিগ্রহণকৃত জায়গাটিতে এখনো পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারেননি গবেষকবৃন্দ। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সিলেট শহরে যাতায়াতের জন্য বাস নিয়েও ভোগান্তির শেষ নেই। প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ৩টি বাস। বাঁদুড় ঝোলা হয়ে যাতায়াত করতে হয়। ফলে যারা সিলেট শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসেন, তারা পড়েন চরম বিপাকে। ডাইনিং এর খাবার নিয়েও রয়েছে অনেক অভিযোগ। নেই ভালো খেলার মাঠ, অডিটোরিয়ামটাও ছোট। সবকিছু ছাপিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবী হয়ে উঠেছে গবেষণার জন্য মাঠ। অবশ্য সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিঃক্যাম্পাস হিসেবে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ফেঞ্চুগঞ্জ-তামাবিল বাইপাস সড়ক সংলগ্ন খাদিম নগর এলাকায় ১২.৩ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তিন বছর আগে সিলেট জেলা প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জায়গাটি বুঝিয়ে দিয়েছিল। মাত্র ৫০ একর জমি নিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যাত্রা করেছিল যার বেশিরভাগ টিলা ও জঙ্গলবেষ্টিত।

ছোট-বড় টিলা পরিবেষ্টিত ৫০ একর আয়তনের মনোরম সিকৃবি ক্যাম্পাস। সবুজে ঘেরা, ছোট ছোট টিলা ক্যাম্পাসের পরিবেশকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। আয়তনে ছোট হলেও এর রূপ-সৌন্দর্য্য আমাদের হৃদয়ে আলাদা একটা টান ও ভালবাসা জন্মায়। প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে দেখেছি কিভাবে ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়িয়েছে আমার প্রিয় ক্যাম্পাসটি। সিকৃবির শিক্ষার্থীরা এখানকার বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দিয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়েছে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো মননশীল চিন্তা করতে সাহায্য করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে আর আড্ডা হবে না সেটা কি হয়! কেউ কেউ আবার ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে দেয় আড্ডা। এর মধ্যে ফুচকা চত্বর, জালাল মামার চায়ের দোকান, ট্যাংকির তলা, কাঁঠাল তলা, ক্যাফেটেরিয়া, ইকোপার্ক ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়।

স্কুলে ভর্তি হবার পর বাবা-মা তাদের সন্তানদের মাথায় শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ভূত চাপিয়ে দেন। কিন্তু কৃষিও একটি মহান পেশা। শুধুমাত্র কৃষিবিদদের গবেষণা ও পরিশ্রমের ফলে কৃষক আজ টনকে টন ধান, পুকুর ভরা মাছ ঘরে তুলছে, মাংস ও ডিমের মাধ্যমে আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়েও বছরে ২-৩ লাখ টন চাল রপ্তানির সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার থেকে হুট করে কয়েক লাখ মানুষ আমাদের দেশে ঢুকে পরে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তখনো ভয় পাননি। বলেছিলেন, ১৬ কোটি মানুষকে যেভাবে খাওয়াতে পারি, ৭ লাখ মানুষকেও খাওয়াতে পারবো। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দিক থেকে পোশাক এবং জনশক্তির পর এখন মাছ ও শাক-সবজির অবস্থান। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তথা দেশের সামগ্রিক কৃষির এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি আশার প্রতিশ্রুতি।

 

লেখক : খলিলুর রহমান ফয়সাল

সহকারী পরিচালক, জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তর

এবং প্রাক্তন ছাত্র, কৃষি অনুষদ
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

 

About Argho Chanda

Check Also

যবিপ্রবির স্নাতক ভর্তি পরীক্ষার আসন বিন্যাস প্রকাশ

মোসাব্বির হোসাইন, যবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *