Wednesday , November 21 2018
সর্বশেষ
Home / প্রথম পাতা / বিশ্ব শিক্ষক দিবস; একজন নিবেদিত কারিগর লতিফ স্যার

বিশ্ব শিক্ষক দিবস; একজন নিবেদিত কারিগর লতিফ স্যার

মো. ইউসুফ আলী: ক্লাস ওয়ান থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত ছাত্র জীবনের ২১। ছোট জীবনের এই দীর্ঘ ছাত্রজীবনে কত শিক্ষক প্রিয় হয়েছে। তারপরও শিক্ষা, শ্রম আর দূরদর্শীতার জন্য মোটাদাগে যদি একজন প্রিয় শিক্ষকের নাম উল্লেখ করতে বলা হয় তিনি হবেন লতিফ স্যার। প্রাইমারিতে ৫ম শ্রেণীতে থাকতে ৭-৮ মাসের প্রাইভেট শিক্ষক ছিলেন তিনি। মজার বিষয় হলো স্যারের পুরো নামটা আজো আমার জানা নেই। অথচ সেই শিক্ষকই আমার জীবনের গতিপথকে পাল্টে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে স্থান দখল করে আছে মনের গভীরে।

সর্বদা রঙিন পাঞ্জাবি, টুপি আর লুঙ্গি পড়া মফস্বলের একজন স্কুল শিক্ষক তিনি। ধবধবে সাদা লম্বা দাঁড়ি, ছোট ছোট গোঁফ, শ্যামলা বর্ণ আর মাঝারি গড়নের একজন সাদাসিদা মানুষটিতে রয়েছে অনেকটা ভাসানীর চেহারার ছাপ। অত্যন্ত সাদাসিদা আর প্রাঞ্জল মানুষটির কাছে আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে অনেকটা কাকতালীয়ভাবে। প ম শ্রেণীতে থাকতে পর্যায়ক্রমে দুজন শিক্ষক চাকরিতে চলে গেলে একমাত্র প্রাইভেট মাস্টার হিসেবে পাই এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে। প্রথমদিনের সাক্ষাতে খিটখিটে গ্রাম্য শিক্ষক মনে হলেও কে জানতো এই শিক্ষক আমার জীবনে এত বড় নেয়ামত হিসেবে আবিভ’ত হবে? গ্রামের স্কুলে পড়ুয়া যে ছেলেটা ঠিকমত বুঝতো না বৃত্তি পরীক্ষা কি, জানতো না জেলার সবচেয়ে ভালো মাধ্যমিক স্কুলের নাম! তখন তিনিই জীবনকে শিক্ষার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ছোটবেলায় দূরন্ত ছিলাম। পড়াশুনা করিনি বলেলেই চলে। যা পড়াশুনা করার সেটা স্যারের কাছে বসেই করতে হয়েছে। প্রাইভেট ছিল সপ্তাহে ৭ দিন। যেতাম ঘুম থেকে উঠে সকাল ৬ টায় আর ফিরতাম সাড়ে ৮টা থেকে ৯টা নাগাদ। তারপর কোন রকম নেয়ে-খেয়ে ছুটতাম স্কুলে। স্কুলে বিশেষ কিছু শিখেছি বলে মনে পড়ে না। যেহেতু স্যারের কাছে ছাড়া সারাদিন কখনো পড়তে বসি নি তাই পড়াশুনা কখনোই পারতাম না। অবস্থা বেগতিক দেখে স্যার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ বৃত্তি পরীক্ষার ছুটিতে পড়ার সকাল ৬-১২টা! ম্যাডাম (স্যারের স্ত্রী) প্রায় প্রতিদিনই মুড়ি-মুড়কির সাথে পেঁপে, পেয়ার ইত্যাদি জলখাবারের ব্যবস্থা করতেন।

স্যার ৯ টা পর্যন্ত পড়িয়ে আধা ঘণ্টা খাবার বিরতি দিয়ে ১-২ ঘণ্টার জন্য বাইরে যেতেন। কখনো বাজারে, কখনো আবার জমি দেখতে যেতেন। তখন আমরা ৬ জন ছাত্র লুকিয়ে আনা ব্যাট-বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। স্যার ফিরবার আগদিয়ে পড়তে বসতাম। আর যেদিন স্যার থাকতেন সেদিন বিভিন্ন বায়নায় কখনো স্যারের সাথে গল্প জুড়ে দিতাম আবার কখনো স্যারের পুকুরে মাছ ধরা দেখতে যেতাম। তারপরও বাধ্য হয়ে পড়তে হয়েছে। সঙ্গত কারণেই বৃত্তি পাইনি। তবে স্যারের কাছে পড়া শিক্ষার্থীরা সকলেই জেলার সবচেয়ে ভালো স্কুলে (হরিমোহন) চান্স পেয়েছিলাম। স্যারই আমাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। রেজাল্টাও স্যারই জানিয়েছিলেন। অত্যন্ত খুশি হয়ে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে আব্বা-মাকে বলেছিলেন, ও ভালো করবে। স্যারের সেই বলা কথা আজো ভুলতে পারি নি। মনে হয় যেন কিছুক্ষণ আগে বললেন।

স্যারের সেই দিনগুলির অনুপ্রেরণা আর দোয়ায় শিক্ষা জীবনের আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি হয়েছে। আজ নিজের পরিচয় হয়েছে বিসিএস ক্যাডার। ৩৭তম বিসিএসে মৎস্য কাডারের উপ-সহকারী পরিচালক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। গত ঈদে গিয়েছিলাম স্যারের বাড়িতে। দেখা হলো, কথা হলো। ১৪-১৫ বছর পরও স্যার আগের মতই আছেন। হয়তো চামড়া কিছুটা ঢিল হয়েছে। দেখা শেষে মনে হচ্ছি স্যারের সাথে একবার কোলাকুলি করি। সাহস হয়নি। আবার মনে হয়েছে পা ছুঁয়ে একবার সালাম করি। অনভ্যাসের কারণে হোক আর অদৃশ্য কারণেই হোক সেটাও হয়ে উঠে নি। তারপরও স্যারই আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক। স্যার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাটা অমলিন থাকবে জীবনভর। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে লতিফ স্যারসহ সকল শিক্ষকম-লীর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

******
মো. ইউসুফ আলী
উপ-সহকারী পরিচালক
৩৭তম বিসিএস মৎস্য ক্যাডার (সুপারিশপ্রাপ্ত)

শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

About Editor

Check Also

ডেইরী শিল্পে সফলতার অপর নাম “কৃষিবিদ ডেইরী ফার্ম”

অনিক অাহমেদ, সাভার, ঢাকা: দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের প্রাণিজ অামিষের চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *