Wednesday , November 21 2018
সর্বশেষ
Home / কৃষি বিভাগ / স্বাদে গন্ধে অপূর্ব চুয়াডাঙ্গার অাবুল কাসেমের থাই বারোমাসী আম

স্বাদে গন্ধে অপূর্ব চুয়াডাঙ্গার অাবুল কাসেমের থাই বারোমাসী আম

কৃষিবিদ ড. মো. আখতারুজ্জামান: অনেকটা আকস্মিকভাবেই আজকে (১৮ সেপ্টেমর, মঙ্গলবার) চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার বাঁকা গ্রামের চাষী আবুল কাসেমের বারোমাসী আম বাগান পরিদর্শন করি। চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অনুষ্ঠিত ভূট্টা বীজ চাষী ও বীজ ব্যবসায়ীদের সাথে মত বিনিময় শেষে যশোর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অভিভাবক তথা এই অঞ্চলের কৃষির পুরাধা অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ চন্ডী দাস কুন্ডু স্যারের সাথে জীবনগরের অাবুল কাসেমের বারোমাসী আম বাগান পরিদর্শনের চমৎকার একটা সুযোগ পেয়ে যাই।

আমরা বারোমাসী আমের নাম কম বেশি সবাই শুনেছি; কিন্তু বারোমাসী আম বলতে যে দু’চারটে বারোমাসী আমের জাতের সন্ধান আমাদের জানা আছে সেগুলোর কোনোটারই গুণগত মান সন্তোষজনক নয়। সাধারণভাবে বারোমাসী আম আকারে ছোট ও টক হয়ে থাকে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রুট ট্রি ইম্প্রুভমেন্ট প্রকল্প হতে যে দু’একটি  বারোমাসী আমের জাতের প্রবর্তন করা হয়েছিল সেসব আমও সার্বিক গুণগত মানের বিচারে তেমন একটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।

একই গাছে পরিপুষ্ট অাম ও পাশে নতুন মুকুল

আকস্মিকভাবে হালে এমন একটা বারোমাসী আমের প্রবর্তন ও সম্প্রসারণ করে চলেছেন চুয়াডাঙ্গার আম বাগানী ও নার্সারী মালিক আবুল কাসেম। আবুল কাসেমের বাগানের এই বারোমাসী আম স্বাদে গন্ধে অপূর্ব অতুলনীয়। আজ (১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮) তারিখে আবুল কাসেমের আম বাগানে যেয়ে পাকা আমের রসনায় তৃপ্ত হয়ে নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না অসময়ে প্রাপ্ত বারোমাসী আমের স্বাদ দেখে। অতিরিক্ত পরিচালক স্যার দুপুরের কাঠফাঁটা রোদে আম বাগানের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কৃষক আবুল কাসেমের একটা এক্সক্লুসিভ সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন এবং গাছপাকা বারোমাসী আমের স্বাদ গ্রহণ করেন। স্যারের সাথে আমি সহ আরো উপস্থিত ছিলেন জীবননগর উপজেলা কৃ্ষি অফিসার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও গাংনীর উপজেলা কৃষি অফিসার কে এম শাহাবুদ্দিন প্রমুখ।

আবুল কাসেমের দেয়া তথ্যানুসারে তার প্রবর্তিত এই বারোমাসী আমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো:

১। বছরে তিনবার ধরে এবং প্রতি গাছে আমের সংখ্যাও যথেষ্ট বেশি।
২। প্রতিটি মৌসুমেরই প্রতিটি আমের ওজন ২০০-৩০০ গ্রামের মত।
৩। লম্বাটে জাতের এই আম পাকলে হলুদাভ সুষম রং হয়। পাকা আম দেখলে মনে হবে কেমিক্যালে পাকানো আম।
৪। আমে কোন আঁশ নেই।
৫। অামে রোগবালাই নেই বললেই চলে। আম বাগানেও কোন রোগ বালাইয়ের দেখা মেলেনি।
৬। প্রতিটি মৌসুমের আমের স্বাদই অপূর্ব।
৭। আমের বর্তমান পাইকারী বাজার মূল্য ২০০-২৫০টাকা কেজি।
৮। স্বাভাবিক রুমের তাপমাত্রায় এই আম ২০-২৫ দিন পর্যন্ত অনায়াসে সংরক্ষণ করা যায়।

গাছ থেকে সংগৃহীত অাম

থাই এই বারোমাসী আম কিভাবে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সম্প্রসারিত হলো সেটা নিয়ে আছে আরেক মজাদার কাহিনী।

এই আমের প্রবর্তক জীবননগরের সার ব্যবসায়ী নুর ইসলাম, যিনি আবুল কাসেমের খুব কাছের বন্ধু । বেড়ানোর কাজে নুর ইসলাম ২০১০ সালে থাইল্যান্ড ভ্রমনের প্রাক্কালে লুকিয়ে এমন একটা আমের চারা সংগ্রহ করে এনে আবুল কাসেমের কাছে হস্তান্তর করেন। আবুল কাসেমের অনুরোধেই নুর ইসলাম এই চারাটি থাইল্যাণ্ড থেকে সংগ্রহ করে অানেন। এমন আমের খবর লোক মারফত আগেই জেনেছিলেন আবুল কাসেম। একটিমাত্র আমের চারাকে আবুল কাশেম গোপনে পরম যত্ন ও মমতায় বড় করত; এটার গুণগত মান যাচাই করতে থাকেন। পরে এটার সার্বিক মান নিশ্চিত হওয়ার পরে সেটা সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শুরুতে তিনি এই আমের ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করেন এজন্য যেন কেউ এটার পেটেন্ট চুরি করতে না পারে। একটা লাভজনক অবস্থায় আসার পরে আবুল কাসেম এটার গুণপনা জনগনের জন্য অবমুক্ত করেন। বর্তমানে আবুল কাসেমের ২০ বিঘা জমিতে এখন বারোমাসী জাতের এই আম রয়েছে। তার আম বাগানে কাঁচাপাকা আম ও মুকুলের সমারোহ এবং আমভাঙ্গার মহড়া দেখে মনে হচ্ছিল এটা যেন আমের ভরা মৌসুম। জীবননগর থেকে কালিগঞ্জের দিকে ২ কিমি অগ্রসর হলে রাস্তার ডান পাশে বিজিবি ক্যাম্পের পূর্বপাশে তেতুলিয়া নামক স্থানে “নাজমূল নার্সারী” নামে আবুল কাসেমের একটা বড় নার্সারীতে এখনো ২ লাখ উন্নতমানের থাই বারোমাসী আমের চারা মজুদ রয়েছে বলে জানান আবুল কাসেম।

নার্সারী স্থলে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত পরিচালক চন্ডী স্যার এই জাত সম্প্রসারণের জন্যে মুঠোফোনে কথা বললেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার ইউং ও সরেজমিন ইউং এর পরিচালক মহোদয়দের সাথে। অতিরিক্ত পরিচালক স্যার বারোমাসী এই জাত দ্রুত সম্প্রসারণের ব্যাপারে আবুল কাসেমকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস প্রদান করেন।

অাবুল কাসেমের নার্সারীতে লেখক (বামে), কৃষিবিদ জিন্নাহ (ডানে) ও কৃষক অাবুল কাসেম

নার্সারী মালিক আবুল কাসেম জানান, স্থানীয় উপ সহকারী কৃষি অফিসার শাহ আলম এবং জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ নিয়মিত বাগানের পরিচর্যার ব্যাপারে কারিগরী পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

আপনারা কেউ যদি বারোমাসী এই থাই আম সম্পর্কে জানতে চান বা এই আমের চারা সংগ্রহ করতে চান তাহলে নিচের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন:
১। আবুল কাসেম: ০১৭১৬-৩৩১৯৫৫
২। নাজমুল (আবুল কাসেমের বড় ছেলে): ০১৯৩১-২৪৯৭৩৭
৩। তাজুল (আবুল কাসেমের মেঝ ছেলে): ০১৯৩১-৭৩৪০৪১

প্রতিটি আম কলমের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০-২০০ টাকা; তবে পাইকারী ভিত্তিতে সংগ্রহ করতে চাইলে সেখানে কিছু মূল্য ছাড় পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট নার্সারী কর্তৃপক্ষ সূত্রে  জানা গেছে।

লেখক: উপ-পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মেহেরপুর।

About Anik Ahmed

Check Also

ডেইরী শিল্পে সফলতার অপর নাম “কৃষিবিদ ডেইরী ফার্ম”

অনিক অাহমেদ, সাভার, ঢাকা: দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের প্রাণিজ অামিষের চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *