Wednesday , November 21 2018
সর্বশেষ
Home / প্রথম পাতা / মাছ, হাঁস -মুরগি ও গো-খাদ্য হিসাবে এজোলার উৎপাদন ও ব্যবহার পদ্ধতি

মাছ, হাঁস -মুরগি ও গো-খাদ্য হিসাবে এজোলার উৎপাদন ও ব্যবহার পদ্ধতি

এজোলা মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে এর তুলনা হয়না, অথচ এর চাষ পদ্ধতি ও এর ব্যবহার নিয়ে আমাদের দেশে আলোচনা নেই বললেই চলে, আরো অবাক হই যখন দেখি অধিকাংশ চাষি ভাইয়েরা এজোলা চেনেইনা, আমার আজকের প্রচেষ্টা তাদের জন্য.।

বাংলাদেশে এজোলাকে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন নামে চেনে, যেমন- ক্ষুদিপানা, তেঁতুলিয়াপানা, বুটিপানা, কুটিপানা ইত্যাদি নামে পরিচিত। এজোলা যদিও ক্ষুদিপানা, তেঁতুলিয়াপানা, বুটিপানা, কুটিপানার গোত্রের মতই কিন্তু ভিন্ন, ক্ষুদিপানা, তেঁতুলিয়াপানা, বুটিপানা, কুটিপানা থেকে এজোলার পুষ্টিমান বেশী, এজোলা ফার্নজাতীয় ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ। তাই ধান ক্ষেতেও হয়, এর ভাসমান গুচ্ছগুলো ত্রিকোণাকার। প্রতিটি ভাসমান গুচ্ছের প্রধান কা-র উভয় দিক থেকে ৮-৯টি শাখা বের হয়। প্রতিটি শাখায় ১০-১২টি পাতা উভয় দিকে একটির পর একটি সাজানো থাকে। যৌন (বীজ) ও অযৌন (অঙ্গজ) উভয় পদ্ধতিতে এজোলা বংশ বৃদ্ধি করে। পানিতে ভাসমান অবস্থায় এজোলার বংশ বৃদ্ধি ভালো হয়। কাদামাটিতে এজোলা বেঁচে থাকতে পারে। সাধারণত ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তাই এর অঙ্গজ বংশ বিস্তার দ্রুত হয়। তাপমাত্রা বেশি হলে যেমন চৈত্র-বৈশাখ মাসে প্রচন্ড গরম ও প্রখর রোদে এজোলা বংশ বৃদ্ধি করে না, তবে বেঁচে থাকে।

এজোলা মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর উৎকৃষ্ট আমিষজাতীয় খাদ্য। এজোলা উৎপাদনে তেমন খরচ লাগে না, এ ছাড়া এজোলা মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর উৎকৃষ্ট আমিষজাতীয় খাদ্য। এজোলাতে আছে প্রায় ২৪-৩০% প্রোটিন এবং এটা মাছ সহ অন্যান্য প্রানি দেহে সহজে হজম হয় এবং এর বহুবিদ গুন রয়েছে, তাড়াও ধান ক্ষেতেও এক প্রকারের এজোলা প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হয়, সেটা যদি আমরা জমির কাদার পা দিয়ে পিষ্টে দিতে পারি তাহলেও সেটা হতে পারে উন্নতমানের নাইট্রোজেন জৈব সার। এজোলা ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন খরচ কমে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, মাটির উর্বরতা বাড়বে, পরিবেশ ভালো থাকবে। ধান ক্ষেতে উৎপাদিত এজোলা মাছ , গ্রু ও মুরগিকে খাওয়ানো যাবেনা, কারন জমিতে হেভি মেটাল থাকলে, এজোলা সেটা গ্রহন করে, তাই নিরাপদ জায়গায় এজোলা চাষ করে মাছ, গ্রু ও মুরগিকে সেটা খাওয়াতে হয়।

এজোলা চাষ পদ্ধতিঃ এজোলা সরাসরি রোদে ও প্রচণ্ড গরমে বংশ বিস্তার করেনা, তবে বেঁচে থাকতে পারে, তাই এজোলার ট্যাঙ্ক ছায়া যুক্ত উন্মুক্ত স্থানে বানাতে হয়, এজোলার ট্যাঙ্ক আপনি পাকা করে বানাতে পারেন আবার ৬ ইঞ্চি মাটি কেঁটে গভীর করে মাটির উপরে সাইডে চারদিকে একটি করে ইট দিয়ে তারপর পলিথিন বিছিয়ে তার মধ্যে পানি সহ অন্যান্য উপকরন দিয়ে এজোলার চাষ করতে পারেন, এজোলা ট্যাঙ্ক বানাতে হবে দৈর্ঘ্য ২ মিটার ও প্রস্ত ১ মিটার এই র‍্যাশিওতে এবং গভিরতা ১ ফুটের মত হলেই চলবে, ট্যাঙ্কের লেয়ারে ৮-১০ সেন্টি মিটার পুরু করে দোঁয়াশ মাটি দিন, তারপর এক থেকে দেড় কেজি গোবর পানিতে গুলিয়ে দিন এর সাথে ভাল ফলাফলের জন্য আরও দিতে পারেন ১০ গ্রাম পরিমাণ সুপার ফসফেট (না দিলেও সমস্যা নাই) / সবচেয়ে ভাল হবে যদি দিতে পারেন ৫০০ গ্রাম ঘন জিবাম্রুত বা ২ লিটার তরল জীব আম্রুত, ঘন বা তরল জিবাম্রুত দিলে গোবর ও ফসফেট দেওয়ার দরকার নাই, তারপর সেখানে মাটি থেকে ৫-৬ ইঞ্চি বা ১৫ সেন্টি মিটার গভীর হয় মত পরিমাণ ফ্রেস টিউবওয়েলের পানি দিয়ে পূর্ণ করুন, পানি দেওয়ার পর পানির উপরে ভেসে থাকা মাটির ফ্যানা থাকলে তুলে ফেলে দিন, তারপর সেখানে বীজ সরূপ ২০০ গ্রাম পরিমাণ সতেজ এজোলা ছেড়ে দিন, ১৫ অপেক্ষার পরেই আপনার এজোলা প্রস্তুত মাছ মুরগি ও গ্রুর জন্য, তারপর বীজের জন্য ২০০-৩০০ গ্রাম রেখে বাদ বাকি গুলো সংগ্রহ ক্রুন, এভাবেই ১৫ দিন অন্তর আপনার এজোলা ফলন ঘরে তুলুন।

পুকুরে সরাসরি দিতে পারেন বা হাতে তৈরি খাবারের সাথে মিশিয়েও খাওয়াতে পারেন, ফলাফল পাবেন এক কোথায় চমৎকার, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এজোলা উৎপাদন ও গবেষণা হয়েছে। বোরো ও আমন ক্ষেতেও চাষ করে মাটির সঙ্গে মেশানো যায়। প্রাথমিকভাবে প্রতি বর্গমিটারে ১০০-২০০ গ্রাম সতেজ এজোলা বীজ হিসেবে জলাশয় অথবা ধানের জমিতে ছড়িয়ে দিতে হবে। সেই সঙ্গে প্রতি হেক্টরে ৮-১০ কেজি টিএসপি ৮-১০ কেজি, ১৫-২০ দিন পর পর প্রয়োগ করতে হবে। উপযুক্ত পরিবেশে ধান ক্ষেতে ১০-২০ দিনের মধ্যে এজোলা অঙ্গজ বংশবিস্তার করে। এজোলা উৎপাদনের জন্য ধানের চারা রোপণের ৫-৭ দিন পর বীজ হিসেবে ১০০-১২০ গ্রাম সতেজ এজোলা জমিতে ছিটাতে হবে। ১৫-২০ দিন পর পর জমির মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয় অথবা উঠিয়ে অন্য জমিতে ব্যবহার করা যায়।

সারা বছর এজোলার বীজতলা সংরক্ষণ করা যেতে পারে। বৃষ্টি ও রোদ থেকে রক্ষার জন্য মাচা করা যেতে পারে। বীজতলায় সর্বদা ৮-১০ সেমি পানি থাকতে হবে।। প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২৫০-৫০০ গ্রাম গোবর বা ২০০ গ্রাম ঘন জীব আম্রুত বা ৫০০ এম এল তরল জীব আম্রুত ১০-১২ দিন পর পর দিতে হবে। এজোলা দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। এ প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগালে মাছ, গবাদিপশু, ডিম ও দুধের উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য এজোলা বিরাট ভূমিকা পালন করবে।

প্রাণীর খাদ্য হিসেবেঃ এজোলা মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার হয়। দুধ, মাংশ, ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গবাদিপ্রানিকে বিভিন্ন সিনথেটিক এনটিবায়োটিক, স্টেরয়েড এবং ভিটামিন খাওয়ানো হয়। খাদ্য হিসাবে বিভিন্ন এনিমেল প্রোডাক্ট ব্যবহারের কারনে এইসব রাসায়নিক পদার্থ মানুষের শরীরে জমা হয়ে বিভিন্ন রোগ হয়। যদি আমরা বিকল্প খাদ্য হিসাবে পুষ্টি সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক খাদ্য গবাদি পশুকে সরবরাহ করতে পারি তাহলে মানুষ এবং প্রাণিস্বাস্থের জন্য তা হবে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ্যাজোলা হতে পারে গবাদি পশুর এমন একটি বিকল্পখাদ্য। আমরা জানি প্রোটিন একটি অন্যতম পুষ্টি উপাদান কিন্তু আমাদের দেশে গবাদি পশুকে যে ধরনের খাদ্য সরবরাহ করা হয় তা সবই কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য উপাদান। কিন্তু দুগ্ধবতী গাভীর জন্য সরবরাহকৃত খাদ্যে একটি নিদিষ্ট মাত্রায় প্রোটিন থাকা দরকার। এজোলায় আছে সেই প্রয়োজনীয় প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য প্রান, এজোলায় প্রচুর আমিষ ও চর্বি থাকায় উচ্চমানের খাদ্য তৈরি হয়। রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এজোলায় আমিষ ২৪-৩০% প্রায়, অ্যাশ ১০%, শ্বেতসার ৬-৬.৫%, চর্বি ৩-৩.৫%, দ্রবীভূত সুগার ৩-৩.৫% ও ক্লোরোফিল এ ০.২৫- ০.৫%, আরও আছে অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিড, গ্রোথপ্রেমোটর (ভিটামিন এ, ভিটামিন বি১২, বেটা-কেরোটিন) , খনিজ উপাদান যেমন-ক্যালশিয়াম, ফসফরাস, পটপশিয়াম, ফেরাস(লৌহ), জিঙ্ক
পর্যাপ্ত পরিমানে থাকে। এজোলা তৈরি খাদ্যে মুরগির ডিমের উৎপাদন বাড়ায়, কুসুম বেশি হলুদ বর্ণ হয়, ডিম ও মাংসে বেশি আমিষ থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। গবাদিপশুর দৈহিক বৃদ্ধি ও দুধ উৎপাদন বাড়ে। মাছ চাষে পুকুরে পানি বিশুদ্ধ রাখে ও মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, মাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। এজোলা দিয়ে পশু-পাখি খাদ্য ও মাছের উৎপাদনে খরচ কম হয়।

জৈব সার ও ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে এজোলার ব্যবহারঃ

চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের কৃষকরা ধানক্ষেতে জীবাণুসার হিসেবে এজোলা চাষ করে। এজোলা ধান গাছে নাইট্রোজেনের চাহিদা পূরণ করে এবং জৈব পদার্থ মিশে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। আমাদের দেশে বোরো ও আমনের জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই এজোলা জন্মে। কৃষকরা না জানা ও না চেনার কারণে আগাছা মনে করে জমি থেকে পরিষ্কার করে ফেলে দেয়। অথচ এজোলা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেই ১৫ দিনের মধ্যে পচে মাটিতে নাইঙ্গ্রোজেন সরবরাহ করে। অন্যান্য ফসলের জমিতে এজোলা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণ করা যায়। রোপা ধানে এজোলা ব্যবহার করে ২০-২৫ ভাগ ফলন বাড়ানো যায়। ধান ক্ষেতে এজোলা পানির উপরিভাগ ঢেকে রাখে বিধায় সূর্যের আলো পানির নিচে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে আগাছা জন্মাতে পারে না। এতে শ্রমিকের খরচ সাশ্রয় হয়।

লেখকঃ মো. সালাহ্উদ্দিন তপন সরকার

ব্যবস্থাপনা পরিচালক,

এডভ্যান্স এগ্রোটেক লিমিটেড(বাংলাদেশ)

About Mostafizur Rahman

Check Also

ডেইরী শিল্পে সফলতার অপর নাম “কৃষিবিদ ডেইরী ফার্ম”

অনিক অাহমেদ, সাভার, ঢাকা: দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের প্রাণিজ অামিষের চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *