Sunday , December 16 2018
সর্বশেষ
Home / প্রাণিসম্পদ / বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অামাদের করণীয়

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অামাদের করণীয়

যতদিন ধরে এই গ্রহে মানবসভ্যতা শুরু হয়েছে, মানুষের সাথে প্রানীর সম্পর্কের বয়স ততদিন থেকেই। মানুষ বেচে থাকার জন্য হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রাণিকুলকে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত মানবজাতির সাথে মিশে আছে প্রাণিকুল বা আমাদের আজকের প্রানীসম্পদ।
আসলে প্রাণিসম্পদ বলতে বোঝায়,
আরবের ইতিহাসের সাথে যেমন মিশে আছে উট, মেষ, দুম্বা; ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে গরু, ছাগল, ভেড়ার কথা; তত্কালীন স্বয়ংসম্পূর্ণ  বৈশ্বিক মুক্ত বাজার অর্থীনীতি সব কিছুর সাথে মিশে আছে আমাদের প্রাণিসম্পদ।
ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশে উন্নত জাতের গবাদিপশুর ইতিহাস খুব বেশি দিনের না। ভারত বিভাগের পূর্বে দেশি গরুর উন্নয়নের জন্য লর্ড লিনথেলিডগো বাংলা প্রদেশে কয়েকটি হাড়িয়ানা গরু আমদানি করেন। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে এদেশে সিন্ধী, শাহিওয়াল,থার্পারকার ইত্যাদি কয়েকটি জাতের গরু আনা হয়। ১৯৫৮ সালে শুরু হয় কৃত্রিম গর্ভধারণ।১৯৬৯-১৯৮২ সাল পর্যন্ত জার্মান বিশেষজ্ঞরা সাভার গবাদি প্রাণির খামারে হালচাষ/ভারবাহী ষাঁড় ও দুধেল গাইয়ের উপযুক্ত জাত উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৭৪ সালে অস্ট্রেলীয় সরকার বাংলাদেশকে হলস্টেইন ফ্রিসিয়ান জাতের কিছু প্রজনক ষাঁড় ও দুধেল গাই উপহার দেয়
তদুপরি দেশী গরু উন্নয়নের জন্য Bos taurus প্রজাতির ষাঁড়ের হিমায়িত শুত্রুও আনা হয়েছিল জার্মানি, আমেরিকা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান থেকে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এজেন্সির (JICA) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে দুই দেশের বিজ্ঞানীরা সাফল্যের সঙ্গে ভ্রূণ সংস্থাপন করেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে প্রাণিপাখির ঘনত্ব বেশি। বর্তমানে এ দেশে ২৫.৭ মিলিয়ন গরু, ০.৮৩ মিলিয়ন মহিষ, ১৪.৮ মিলিয়ন ছাগল, ১.৯ মিলিয়ন ভেড়া, ১১৮.৭ মিলিয়ন মুরগি এবং ৩৪.১ মিলিয়ন হাঁস রয়েছে । প্রতি একর আবাদযোগ্য জমিতে প্রাণি-পাখির ঘনত্ব ৭.৩৭। বছরের পর বছর এদেশে প্রাণি-পাখির ঘনত্ব বেড়েছে। কিন্তু এসব প্রাণি-পাখির তুলনায় উৎপাদনশীলতা খুবই কম বিধায় প্রয়োজনের তুলনায় প্রাণি-পাখি উপজাতের জনপ্রতি প্রাপ্যতা খুবই কম।
দেশে বর্তমানে দুধ, মাংস ও ডিমের ঘাটতি যথাক্রমে শতকরা ৮৫.৯, ৮৮.১ এবং ৭০.৭ ভাগ।
কিন্তু ভিশন ২০২১ এ ধরা হয়েছে একজন মানুষ দৈনিক ১৫০ মিলি দুধ পান করবে, ১১০ মিগ্রা মাংশ খাবে এবং বছরে ১০৪ টি ডিম খাবে। যা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে অনেক উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।
একথা বলা বাহুল্য যে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে ৯৯ শতাংশ গরু ব্যাক্তিপর্যায়ে পালন করা হয়। এগুলোকে খামার ব্যাবস্থাপনায় (Farming system) নিয়ে আসতে পারলে উৎপাদন বাড়বে। তাতে দেশের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান ২.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে নিয়ে আসা সম্ভব। প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে বর্তমানে দেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সর্বজন স্বীকৃত প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে এই সেক্টরে জনবল।
বর্তমান বাংলাদেশে গরু, ছাগল, হাস মুরগী মিলিয়ে মোট ৩৭ কোটি প্রাণি পাখি আছে, যার বিপরীতে এই সেক্টরে জনবল আছে সর্বসাকুল্যে ৮৫০০। এর মধ্যে টেকনিক্যাল জনবল আছে মাত্র ১২০০ এর মত। মাত্র এই কয়েকজন মানুষ দ্বারা একটি দেশের এতবড় খাত সামাল দেয়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়।
এছাড়াও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা, ভ্যাক্সিন ব্যবস্থা ছাড়াও নানান সমস্যায় জর্জরিত এদেশের প্রাণিসম্পদ সেক্টর। আর মরার উপর খড়ার ঘা হিসেবে রয়েছে এদেশের কোয়াক ( হাতুড়ে চিকিৎসক) , এরা যত্র তত্র আ্যন্টিবায়োটিক ব্যাবহার করছে, কোন প্ল্যান ছাড়া এ আই (কৃত্রিম প্রজনন) করছে যা আমাদের প্রাণিসম্পদের জন্য হুমকি স্বরুপ।
আর তাই আমরা যদি ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন করতে চাই। তাহলে আমাদের নিম্নোক্ত বিষয়াদির দিকে নজর দিতে হবে।

১. অতিদ্রুত নতুন অর্গানোগ্রাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সেক্টরে জনবল বৃদ্ধি।
২. প্রাণি চিকিৎসায় সুষ্ঠু আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন।
৩. প্রাণি পাখির জাত উন্নয়নে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম জোরদারকরণ এবং দেশী উন্নত জাতগুলো সংরক্ষণ।
৪. উন্নত ঘাস চাষ সম্প্রসারণ ও প্রাণি-পাখির খাদ্য প্রস্ত্ততকারী কারখানা স্থাপনে উৎসাহ প্রদান।
৫. প্রাণি-পাখির টিকা উৎপাদন, প্রদান ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
৬. উন্নত খামার ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান।
৫. নতুন খামার স্থাপনে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধান।
৬. প্রাণি খাদ্য ও প্রাণি চিকিৎসা সামগ্রীর মূল্য কৃষকদের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার জন্য ভর্তুকি প্রদান।
৭. প্রাণি-পাখির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কাজে বেসরকারি সংস্থাসমূহকে সম্পৃক্তকরণ।
৮. প্রাণি-পাখি সংক্রান্ত গবেষণায় অগ্রাধিকার প্রদান।
৯. প্রাণি-পাখিজাত পণ্য সামগ্রীর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে বিশেষ সুবিধা প্রদান।
১০. সহজ শর্তে এবং অল্প সুদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রদানের নিশ্চয়তা বিধান।
১১. প্রাণি-পাখির উন্নয়নে সরকারি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকরণ।
১২. ভূমিহীন কৃষক ও গ্রামীণ মহিলাদের জন্যে প্রাণি-পাখি প্রতিপালনের বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ।
শুধু সরকারি পর্যায়েই নয় বেসরকারি পর্যায়ে আমাদের সচেতন হতে হবে।
১. ব্যাক্তি পর্যায়ে গবাদিপশু পালনে উদোগী হতে হবে।
২. খামারিদের নিয়মিত টিকা দানে উতসাহী হতে হবে।
৩. বিভিন্ন সময় ডিম-মাংশ নিয়ে প্রচারিত নানামুখী গুজবের ব্যাপারে সচেতন থাকা।
৪. প্রাণি পাখির স্বাস্থ্যসেবায় রোগনির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে অতিদ্রুত ব্যাবস্থা গ্রহন করতে হবে।
যাইহোক একথা অনস্বীকার্য যে, এদেশের প্রাণিসম্পদ উন্নত হলে আমরা উন্নত হবে। আজ আমরা যদি আমেরিকা অস্ট্রেলীয়ার দিকে তাকাই তাহলে দেখব তারা আগে কৃষিতে উন্নত হয়েছে পরে টেকনোলজিতে উন্নত হয়েছে। তাই প্রাণিসম্পদ কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে উদোগী হতে হবে এবং আমাদেরকেও সচেতন হতে হবে।

লেখক: অামিনুল ইসলাম, বশেমুরকৃবি

About Anik Ahmed

Check Also

বিজয় দিবসে সকল চিড়িয়াখানায় অনূর্ধ্ব-১৮ বয়সীদের প্রবেশাধিকার ফ্রি

এগ্রিভিউ নিউজ ডেস্ক: ১৬ ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস-১৮ উপলক্ষ্যে ঐ দিন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ভুক্ত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *