Thursday , October 18 2018
সর্বশেষ
Home / প্রথম পাতা / খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি পন্যের মান মূল্যায়ন: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত

খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি পন্যের মান মূল্যায়ন: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়। যেহেতু কৃষি উৎপাদন ইতিমধ্যে প্রধান খাদ্যগুলির দৈনিক চাহিদা পূরণ করেছে সুতরাং, এখন খাদ্য সংকটের কোন সমস্যা নেই। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, কীটনাশক, বিষাক্ত ক্যামিক্যাল, ফুড প্রিজারভেটিভ এর অযৌক্তিক ব্যবহার বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ হুমকি হতে পারে।

গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের স্বল্পতার কারণে “কৃষি পণ্যের বিষক্রিয়া” এই বিশেষ বিভাগে অনেকের আগ্রহ কম। দেশে এবং বিদেশে উভয় ক্ষেত্রে বেশিরভাগ গবেষকই জৈবপ্রযুক্তি, আণবিক জীববিদ্যা, মাইক্রোবায়োলজি ইত্যাদি তথাকথিত প্রচলিত গবেষণার উপর জোর দিয়ে থাকেন। এর ফলে “কৃষি পণ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন” বর্তমান গবেষণা বিশ্বের প্রায়োরিটি লিস্টের শেষের দিকে।

বর্তমান ভয়াবহতা

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য, FAO (জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা) ২০১২ সালে ঢাকার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি পাইলট গবেষণা প্রকল্প হিসেবে “জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবরেটরি” প্রতিষ্ঠা করে। তারা ফলমূল, সবজি, মাছ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্যগুলিতে “ডিডিটি, অ্যালড্রিন, ক্লোর্ডেন, হ্যাপ্টাক্লোর সহ আরো অনেক নিষিদ্ধ কীটনাশক ইতিমধ্যেই রিপোর্ট করেছে। ল্যাব গবেষণার সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, কীটনাশকগুলি “ইউরোপীয় ইউনিয়নের CODEX দ্বারা নির্ধারিত সীমার থেকে ৩-২০ গুণ” বেশি রয়েছে।

মশলাজাতীয় খাবার হেভি মেটাল (Heavy Metal) দ্বারা দূষিত হচ্ছে। যেমন হলুদ গুঁড়া, মরিচের গুঁড়া প্রভৃতি ক্ষতিকর সিসা দ্বারা দূষিত। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক দূষণ এসব খাদ্যসামগ্রীর ভয়াবহতা বৃদ্ধি করছে। এই কারনে লিভার, কিডনির রোগ সহ ক্যান্সার এর মত ভয়াবহ রোগ হতে পারে।

খাদ্য নিরাপত্তা বনাম অপুষ্টি

ফল-মূল ও সবজি পুষ্টির মূল উৎস। তবে, বাজারে এই পণ্যগুলি বর্তমানে দৈনিক ভোক্তাদের জন্য আতংকের বিষয় হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র কোনও বিকল্পের অভাবের জন্য শহরবাসী এই পণ্যগুলি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যা থাকার কারণে, আপনি বাংলাদেশের রাস্তায় ‘অনন্য’ আপেল পেতে পারেন, যার কোনও পরিবর্তন ছাড়াই দীর্ঘ শেলফ লাইফ রয়েছে। এটা সত্যিই ভয়াবহ! এমনকি ফরমালিনের সম্ভাব্য দূষণের কারণে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল আমের প্রতি ভয় বাড়ছে। এইভাবে খাদ্য নিরাপত্তাই অপুষ্টির অন্তরায় হচ্ছে।

ভেজাল খাবারের ঝুঁকি খাদ্য বিষক্রিয়া (Food Poisoning) তৈরি করে এবং বিপজ্জনক রোগ সৃষ্টি করতে পারে। ফলস্বরূপ সচেতন ভোক্তা খাদ্য বিষাক্ততার সম্ভাবনার কারণে পুষ্টির উৎস এড়িয়ে চলেন।

 

সম্ভাবনা এবং প্রত্যাশা

খাদ্য মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত “বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি” শুধুমাত্র বিদেশী গবেষণার তথ্য যেমন CODEX-EU, EPA এর রেগুলেশন অনুযায়ী “Food-Safety-(Contaminants,-Toxins-and-Harmful-Residues)-Regulations,-2017” সহ আরো কিছু রেগুলেশন ও এমেন্ডমেন্ড দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও এসব আইনের বাস্তবায়ন, এখনো বাংলাদেশে প্রশ্নবিদ্য।

UN-FAO-র মত কিছু প্রকল্প ভিত্তিক গবেষণাগার (বিশেষ করে জাতিসংঘ ও ভারতীয় বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত) জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া এই দূষণকারী এবং অন্যান্য উপকরণ পরীক্ষা করার জন্য কোন স্থায়ী বিশ্লেষণের ল্যাবরেটরি বাংলাদেশে নেই।

কৃষি পণ্যগুলিতে জৈব দূষণকারী এবং কীটনাশকগুলির ফসল ভিত্তিক MRL (সর্বাধিক অবশিষ্টাংশ সীমা) এবং ইইউ-কোডেক্স এবং ইপিএ-এর আন্তর্জাতিক সমন্বেয়র জন্য EPA নির্দেশাবলীর সঙ্গে সুসংগতি স্থাপনের সুবিশাল সুযোগ রয়েছে। এই পণ্যগুলির নিয়মিত মনিটরিং সহ LC-MS/MS, GC-MS/MS ইত্যাদি সুবিধাসহ খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যত উন্নয়ন এবং বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চাহিদা সম্পন্ন গবেষনাগার জরুরী।

কেন আমরা ভবিষ্যতে “খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন ইনস্টিটিউট” এর জন্য চিন্তা করি না? যেখানে শুধুমাত্র দেশি কৃষি পন্য নয় বরং আমদানিকৃত পণ্য বিবেচনায় আনা হতে পারে। দূষিত ক্যামিক্যাল এবং কীটনাশক এর জন্য PLS (Positive List System) for minor crops এবং আমদানী সহনশীলতা (Import Tolerance), প্রধান ফসলগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কীটনাশক নিবন্ধন খুব সঠিকভাবে সম্পন্ন করা যাবে এবং ভবিষ্যতে কৃষি পণ্যগুলির অনিরাপদ ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সংস্থাগুলির সাথে একত্রীকরণের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি পণ্যের গুণমানের মূল্যায়ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামগ্রিক সমাধান সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে। যার মাধ্যমে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অপুষ্টিতে খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যত সঙ্কটকে অতিক্রম করতে পারি।

 

                অনিরূদ্ধ সরকার
পিএইচডি গবেষক
এনভায়রনমেন্টাল কেমেস্ট্রি, স্কুল অব এপ্লাইড বায়োসাইন্স
কিয়ংপুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (KNU), দক্ষিণ কোরিয়া।
ই-মেইল: fagunaniruddha@gmail.com

About Editor

Check Also

কালিগ্রাম থেকে উদ্ধারকৃত বিরল প্রজাতির সুন্ধি কাছিম পদ্মা নদীতে অবমুক্ত

শাহকৃষি তথ্য পাঠাগার নওগা হতে উদ্ধারকৃত বিরল প্রজাতির সুন্ধি কাছিমটিকে রাজশাহীর পদ্মা নদীতে অবমুক্ত করা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *