Monday , July 23 2018
সর্বশেষ
Home / কৃষি গবেষনা / জমিতে কীটনাশক প্রয়োগে সুরক্ষা ব্যবস্থা

জমিতে কীটনাশক প্রয়োগে সুরক্ষা ব্যবস্থা

গ্রামের নাম খাগ্রীরহাটা। জেলা শহর থেকে খুব একটা দূরে নয়। রিয়াজ উদ্দীনের ছেলে সোনাজ উদ্দীন অন্যান্য দিনের মতোই তার পোকাধরা ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে করছিল। সোনাজ উদ্দীনের ক্ষেতে পোকা -এটা কেউ কোনদিন দেখেনি। সোনাজের নিকট পোকা তো পোকাই। কিসের আবার উপকারী আর অপকারী পোকা -এমনকি মৌমাছিও তার ক্ষেতে বসবার উপায় নেই। কোন প্রকার জৈব কীটনাশক যেমন- নিমপাতার নির্যাস দিয়েও যে পোকা দমন বা পোকার ক্ষতি থেকে ফসল রক্ষা করা সম্ভব এমনকিছুতে বিশ্বাস নেই সোনাজের। তার একমাত্র ভরসা মুল্লুকের দোকানের কীটনাশক। মুল্লুক মাঝে মাঝে বাজি ধরে- শতভাগ পোকা মরে সাফ হবে। যখন ব্যাঙ চ্যাঙ কেঁচো মরে ক্ষেতের আইল পর্যন্ত একাকার হয় তখন চাষি হিসেবে সোনাজের মুখটা আনন্দে ছলছল করে।

কীটনাশক স্প্রে করার পর মাঝে মাঝে সোনাজের শরীরটা কেমন যেন ধরে আসে। না খেয়ে সকালে কীটনাশক স্প্রে করতে গিয়ে অনেক সময় বমি হয়েছে, মাথা ঘুরে দুই একবার পড়েও গিয়েছে। এতে তার কোন যায় আসে না বরং কড়া চোটের বিষ ভেবে সোনাজ কিছুটা আশ্বস্ত হয়। কীটনাশক বিক্রেতা মুল্লুক তাকে অনেকবার সাবধান হওয়ার কথা বলেছে। এতে উল্টো কথা শুনতে হয়েছে- এতো বড় শরীরে কী আর হবে রে মুল্লুক! সেদিন মুল্লুকের কথা যথার্থ হলো- ক্ষুধার পেটে খালি গায়ে কীটনাশক স্প্রে করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়া সোনাজকে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে তিনদিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এটা কোন কেস স্টাডি নয়- বাস্তব একটা ঘটনা।

কীটনাশক প্রয়োগে অবশ্যই ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেই সাথে কীটনাশকের নির্ভরতা ও ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে একসময় কীটনাশককে ‘না’ বলতে হবে। স্বাস্থ্যের উপর কীটনাশকের ভয়াবহতা বিবেচনায় এনে অর্গানিক এগ্রিকালচারের প্রচলন বাড়ানো আজ আশু প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনাইটেড নেশনের (ইউএন) এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, Small-scale organic farming only way to feed the world.

অর্থাৎ স্বল্প পরিসরে জৈব খামারই বিশ্বব্যাপী খাদ্যচাহিদা মিটানোর একমাত্র উপায়। এদিকে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী বছরে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ কেবলমাত্র কীটনাশকজনিত বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ কিডনি ডেমেজ, হার্ট ফেইল্যুর, ক্যানসার, ইনফার্টিলিটি, ইনফ্যান্ট ডিজএ্যাবিলিটি, সিওপিডি বা ক্রণিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজে আক্রান্ত হয়। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ডেভেলপমেন্টাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট এর প্রফেসর টাইরন বি. হেইজ ও অন্যান্য সহযোগী গবেষকরা তাদের রিসার্চ ফাইন্ডিংসে দেখিয়েছেন, পেস্টিসাইড পুরুষ হরমোন বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন কমিয়ে দেয়। এখানেই শেষ নয়। কীটনাশকের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহার, অযথা উচ্চমাত্রা এবং প্রয়োগের সময় যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষাকারী পোশাক বা পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইক্যুয়েপমেন্ট (পিপিই) পরিধান না করায় সরাসরি বিষের সংস্পর্শে আসে। আর তখনই অ্যাকুট ডিজিজের সাথে সাথে ক্রণিক ডিজিজের ইনিশিয়াল সিম্পটম শুরু হতে থাকে।

আমরা চাষিরা ফসলে পোকামাকড় দেখা দিলেই দিগ্বিদিক না ভেবে কীটনাশকের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ি। এই বুঝি সব ফসলের সর্বনাশ হলো। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত- কীটনাশক যেমন পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করে আবার ঠিক তেমনি কীটনাশকের প্রতি পোকামাকড়ও সহনশীল বা রেজিস্টান্ট ক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকে। ফলে বালাই ব্যবস্থাপনা আরো জটিল হয়ে পড়ে। তখন চাষি কোনপ্রকার জৈবিক কিংবা যান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বরং অত্যধিক মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ করে।

কীটনাশক পরিবেশ প্রতিবেশের অর্থাৎ এনভায়রনমেন্ট এন্ড ইকোসিস্টেমের প্রতিটি ধাপে সর্বনাশা ডেকে আনে, সর্বনাশ করে মানব স্বাস্থ্যেরও। তাই পোকামাকড় দমনে প্রথমেই কীটনাশকের উপর নির্ভরশীল না হয়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্টে (আইপিএম) যে পাঁচটি উপাদানের কথা বলা হয়েছে সেগুলো মেনে চলা উচিত। আইপিএম -এর সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসাবে ফসলে কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ যখন বালাইনাশক ব্যবস্থাপনার আর কোন উপায় থাকে
না এবং ইকোনোমিক থ্রেসহোল্ড লেভেল অতিক্রম করে ও ইকোনোমিক ইনজুরি লেভেলে পৌঁছার সমূহ সম্ভাবনা থাকে কেবলমাত্র তখনই কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।

কৃষিতে পরিবেশ-প্রতিবেশ ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার উপর ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কর্তৃক আয়োজিত কনভেনশনে যে ১৮৪ ধারার কথা বলা হয়েছে তা অনুসমর্থন করলে এবং আইএলও সুপারিশমালার ১৫২ ধারার যথাযথ প্রয়োগ, তদারকি এবং চাষি পর্যায়ে মেনে চললে কীটনাশকের ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কিছুটা হলেও সম্ভব। চাষিদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার, খামার মালিক এবং সকল প্রকার পেস্টিসাইড কোম্পানি কর্তৃক সমন্বিত উপায়ে ফার্ম লেবারদের বিনামূল্যে পিপিই সরবরাহ, পিপিই ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান এবং মাঠ পর্যায়ে কঠোর তদারকি করতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগের সময় একজন চাষিকে যে সমস্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা বা পিপিই পরিধান করতে হয় তা হলো- মাস্ক, গ্লাভস, গগলস, ফেসশিল্ড, হ্যাটস, অ্যাপ্রোন, ঢিলেঢালা ফুল শার্ট প্যান্ট, গামবুট ইত্যাদি। এসব পিপিই’র কোনটিকে বাদ দিয়ে কীটনাশক প্রয়োগ করতে মাঠে গেলে সুরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে অনুসরণ হয় না।

আমাদের দেশে চাষির স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থাটি এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে। কীটনাশক প্রয়োগের মতো বিপদজনক কাজে ঠিক কী কী ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় তা অধিকাংশ চাষির আমলে নেই। হাতে গোনা দুই একজন চাষি কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় স্বাস্থ্যনাশের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থায় তেমনটা অবগত নয় কিংবা মেনে চলে না। কীটনাশকের প্যাকেটের ‘লেবেল’ কেউ পড়েও দেখে না। আবার, নিরক্ষর চাষির জন্য ‘লেবেলে’ নির্দিষ্ট পিপিই গ্রহণের এবং বিপদ মোকাবেলার কোন চিত্র দেওয়া থাকে না। তাই কীটনাশক প্রয়োগে চাষির স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পিপিই ট্রেনিং চালু করা যেতে পারে। এ বিষয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে থাকা কমিউনিটি হাসপাতালগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে চাষিদের মাঝে স্বাস্থ্য বিমা চালু করতে হবে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট (পিআইবি) ফিলিপাইনে স্টাডি ভিজিট সম্পন্ন করেছে। পিআইবি কর্তৃক পরিচালিত ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ প্রকল্পে সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে ‘ফিল হেলথ’ এর কাজ প্রত্যক্ষ করা ছিল এই স্টাডি ভিজিটের মূল উদ্দেশ্য। ফিল হেলথ শুধুমাত্র ২০১৫ সালেই ফিলিপাইনের ৯ কোটি ৩৩ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্য বিমা সুবিধা দিয়েছে যার অর্থায়ন এসেছে ‘সিন ট্যাক্স’ থেকে। ফিল হেলথের ‘হেলথ কার্ড’ দ্বারা এ্যাকুট, ক্রনিক, সার্জারিসহ সকল প্রকার চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে ফিলিপিনীয়রা। তাই, চাষির স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কীটনাশক প্রয়োগে পিপিই সচেতনতা বাড়ানো এবং পিপিই’র সহজলভ্যতার পাশাপাশি বিনামূল্যে বিতরণ করা ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা নেই।

কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলাম
কৃষিবিদ মো. এমদাদুল হক সরকার

About Mostafizur Rahman

Check Also

শেকৃবিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এগ্রিবিজনেসের গুরুত্ব বিষয়ক সেমিনার এবং এগ্রিবিজনেস সোসাইটির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত

আবদুর রহমান রাফি: রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এগ্রিবিজনেসের গুরুত্ব এবং সম্ভাবনা বিষয়ক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *