Friday , October 19 2018
সর্বশেষ
Home / প্রথম পাতা / নিরাপদ মাংস উৎপাদন নিশ্চিতকরণ কিভাবে সম্ভব?

নিরাপদ মাংস উৎপাদন নিশ্চিতকরণ কিভাবে সম্ভব?

আমাদের বাংলাদেশ আজ আমিষের ঘাটতি কমিয়ে পর্যাপ্ত আমিষ উৎপাদন করছে। এটা সম্ভব হয়েছে মূলত হাইব্রিড জাতের মুরগী, মাছ, গরু চাষের খামারের কল্যানে। আজ উৎপাদন প্রাচূর্যের কারনে কম মূল্যে মুরগী ও মাছের যোগান পাওয়া যাচ্ছে। দরিদ্র মানুষের হাতের নাগালে মুরগীর মাংস ও মাছ। অন্যদিকে খামারীরা মূল্য হ্রাসের কারনে ক্ষতির সম্মুখীন। কিন্তু মাংস ভক্ষণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। ২০১৭ সালের হিসেবে মাথাপিছু বার্ষিক মুরগীর মাংস খাওয়া হয়েছে ১.২কেজি যা ভারতে ২.০কেজি, ইন্দোনেশিয়া ৬.৮ কেজি, ইরান ২২.৪কেজি, ইসরাইল ৫৬.৯ কেজি। তাহলে সস্তা পেয়েও মানুষ মাংস খাচ্ছেনা কেন, যেখানে মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১৬০২ মার্কিন ডলার? কারন মনে হয় মানুষের মাঝে মুরগী, ডিম, দুধ ও মাছ এমনকি শাক সব্জী বিষয়েও অনিরাপদতার ভীতি কাজ করে। আবার রপ্তানী করতে গেলেও কিছু কিছু প্যারামিটার বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার অনুমোদিত সীমার মধ্যে থাকতেই হবে। যেমন, মাংসের মধ্যে ভারী ধাতুর মাত্রা, এন্টিবায়োটিক রেজিডিউর মাত্রা, সালমোনেলা, ই-কলাই মাত্রা, কোন জুনোটিক ডিজিজ্ আছে কিনা ইত্যাদি সূচক গুলিতে পরীক্ষায় উত্তীর্ন হওয়া আবশ্যক। এগুলো নিশ্চিৎ করে মাংস উৎপাদন করতে পারলে রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মূদ্রা উপার্যন করা সম্ভব ।

তাহলে আমরা কিভাবে নিরাপদ আমিষ উৎপাদন করতে পারব?
অনেকের প্রশ্ন আদৌ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এন্টিবায়োটিক মুক্ত মাংস উৎপাদন কি সম্ভব? নিরাপদ মাংস উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রাণীর একদিন বয়স থেকেই পালন পদ্ধতি ঠিক করতে হবে এবং সেভাবে পরবর্তী পালনকাল পালন করে যেতে হবে।
যেমন, মুরগীর ক্ষেত্রে একদিন বয়সে তাকে এন্টিবায়োটিক না দিয়ে উপকারী ব্যাকটেরিয়া (প্রোবায়োটিক) ও ধকলরোধী ঔষধ দেয়া উচিৎ।এতে তার বাচ্চাকালীন মৃত্যুর হার এক শতাংশ বড়জোর বেশী হতে পারে আবার নাও হতে পারে। কিন্তু এতে মা থেকে রোগপ্রাপ্ত রুগ্ন বাচ্চাগুলি মারা গেলেও ভালগুলো সংক্রমিত হওয়াথেকে মুক্ত থাকবে এবং বেচে যাওয়াদের গড় ওজন বৃদ্ধি বেশী হবে।তাই সংখ্যা কমলেও মোট উৎপাদন কমবেনা উপরন্তু নিরাপদ মাংস পাওয়ার ক্ষেত্রে একধাপ অগ্রসর হওয়া যাবে। অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে যেমন গরু বা ছাগল হলে অসুস্থতা দেখা দিলে তাদের ডাক্তারের পরামর্শে এন্টিবায়োটিক দেয়া যেতে পারে কারণ এদের মাংস খাওয়ার জন্য অনেক দেরি করতে হবে; ততদিনে এন্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংস মাংসে উপস্থিত থাকবেনা।

এরপরে খাদ্য হিসেবে আমরা সাধারনতঃ বিভিন্ন খাদ্য কোম্পানির তৈরী খাদ্য থাওয়ায়, আর এ খাদ্য গুলো ভারীধাতু সমূহ, এন্টিবায়োটিক, টক্সিন ও জীবানু মুক্ত হওয়া জরুরি। খাদ্য উপাদান ও খাদ্য সংযোজন দ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানীর সময় ভারীধাতু মুক্ত সনদ থাকলে সে বিষয়ে নিশ্চিৎ হওয়া যাবে। আর দেশী উৎসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিজ উদ্যোগে তা পরীক্ষা করা উচিৎ।

এরপরে প্রশ্ন আসবে, এন্টিবায়োটিক না দিলে কি কি বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পারে?
মূলত খাদ্য তৈরির উপাদান সমূহে বিদ্যমান ব্যাকটেরিয়া নিধনের লক্ষ্যে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। বিকল্প হিসেবে ব্যাকটেরিয়া নিধন করতে পারে বা বংশ বৃদ্ধিতে বাঁধা দিতে পারে এমন কিছু জৈব এসিড আছে যা মুরগীর জন্য দূর্বল প্রকৃতি কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার জন্য ক্ষতিকর অর্থাৎ মুরগীর খাদ্যে মিশালে মুরগীর কোন ক্ষতি করবেনা উপরন্তু খাদ্যনালীর অম্লতা রক্ষা করবে যা হজমে ও বিভিন্ন এনজাইমের কার্যকারীতাকে বৃদ্ধি করে অন্যদিকে খাদ্যে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়াকে নিধন করবে। এসব জৈব এসিড হল – বিউটাইরিক এসিড, প্রোপায়োনিক এসিড, এসিটিক এসিড, ফরমিক এসিড, অথবা উহাদের কোন লবন যেমন; সোডিয়াম বিউটাইরেট। এসব এসিডের সাথে নির্দিষ্ট মাত্রায় কিছু এসেন্সিয়াল অয়েল বা প্লান্ট এক্সট্রাক্ট ব্যবহার করা যেতে পাড়ে যা লালার সাথে মিশে এক্টিভ হয়ে ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর ডিজল্ব করে ফেলে যাতে ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। এসব অর্গানিক বা জৈবযৌগ নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগে এন্টিবায়োটিক মুক্ত খাদ্য তৈরী করা সম্ভব। এর সাথে প্রোবায়োটিক জাতীয় উপকারী জীবানুযুক্ত করলে তাও রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।

এভাবে এন্টিবায়োটিক মুক্ত হওয়ার পরে আসতেছে ব্যবহৃত খাদ্যে টক্সিন প্রসংগ। 
প্রদেয় খাদ্যে টক্সিন মূলত তৈরী হয় ব্যবহৃত শস্য দানার গায়ে অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও উপযুক্ত তাপমাত্রার জন্য জন্মান ছত্রাক থেকে। নিচে টক্সিন তৈরীর ফ্যাক্টর গুলো পয়েন্ট আকারে দেয়া হলঃ

১। শস্যদানার আর্দ্রতা বেশী হলে বা পর্যাপ্ত শুকানো না হলে।
২। ছত্রাক জন্মানর উপযুক্ত তাপমাত্রা পেলে।
৩। শস্য দানা অপরিপক্ক অবস্থায় তুললে।
৪। শস্য দানা ফেটে গেলে।
৫। আর্দ্র স্থানে সংরক্ষন করলে।
৬। মোল্ড প্রতিরোধী বা ছত্রাক প্রতিরোধী না দিয়ে সংরক্ষন করলে।

এসব ফ্যাক্টর বর্তমান থাকলে বিভিন্ন ধরনের মোল্ড ও ছত্রাক তৈরী হয় এবং তাহার থেকে নিম্ন লিখিত টক্সিন গুলো তৈরী হতে পারেঃ
১। আফলা টক্সিন বি-১, বি-২, জি-১, জি-২, এম-১।
২। অর্কা টক্সিন।
৩। জিয়ারালেনন।
৪। ফিউমনসিন-১।
৫। ভমিটক্মিন।
৬। টি-২ টক্সিন।

এসকল টক্সিন মুরগী বা গবাদিপশুর কলিজা, কিডনি, অগ্ন্যাশয়, সহ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টিকারী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিসাধন করে, হজম শক্তি কমিয়ে দেয়, ওজন বৃদ্ধি বাঁধাগ্রস্ত করে এবং নানান রোগব্যাধী ঘিরে ধরে। তখন চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়ে। তাই এন্টিবায়োটিক মুক্ত রেখে মাংস উৎপাদন করতে হলে ব্যবহৃত খাদ্য অবশ্যই টক্সিন নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।

টক্সিন নিয়ন্ত্রণের জন্য বাজারে বহু ধরনের টক্সিন বাইন্ডার আছে। ব্যবহারকারীকে দেখতে হবে ব্যবহৃত টক্সিন বাইন্ডার সব ধরনের টক্সিনকে বাইন্ড করতে পারে কিনা। বেশীর ভাগ টক্সিন বাইন্ডার শুধু আফলা টক্সিন কেই বাইন্ড করতে তৈরী। তাই মিক্স প্রকৃতির বাইন্ডার চয়েজ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন- কেসেলগার, সেপিওলাইট, মন্টমরেনোলাইট, এক্টিভেটেট চারকোল। এসবের যেকোন দুইটি বা তিনটির মিশ্রন থাকলে ভাল। আবার খাদ্য উৎপাদনের পরে যাতে নতুন টক্সিন উৎপাদিত না হয় তাহার জন্য মোল্ড ইনহিবিটর যোগ করাও বাঞ্চনীয়। এভাবে টক্সিন মুক্ত বা টক্সিন নিয়ন্ত্রিত প্রাণিখাদ্য তৈরী করতে পারলে আমরা নিরাপদ মাংস উৎপাদনের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে যেতে পারব।

এর পরে নজর দিতে হবে রোগ ব্যধি নিয়ন্ত্রণের দিকে। গবাদীপশু ও পোল্ট্রির প্রধান প্রধান ভাইরাস জনিত রোগ সমূহের ভ্যাকসিন এখন হাতের নাগালে সকল ভাইরাস জনিত রোগের ভ্যাকসিন দিয়ে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তার কার্যকরীতা নিশ্চিৎ করতে হবে। ভ্যকসিন ব্যর্থ হলে পুনরায় তা প্রয়োগ করতে হবে। আমরা অনেক সময় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল রোগের ভ্যাকসিন প্রাপ্যতা সত্ত্বেও তা প্রয়োগ করি না কারন এসব রোগ এন্টিবায়োটিক দিয়ে নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এখানে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে যদি নিরাপদ মাংস উৎপাদন করতে হয়। এসব ভ্যাকসিন পোল্ট্রিতে যেমন- সালমোনেলা, মাইকোপ্লাজমা, করাইজা ইত্যাদি; গরুতে যেমন- এনথ্রাক্স, বি.কিউ, এইচ.এস ইত্যাদি। এর পরেও পোল্ট্রিতে ই-কলাই নিয়ন্ত্রণে পানি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া প্রাকটিস করতে হবে ও সর্বোপরি জৈব নিরাপত্তা প্র্রাকটিস করতে হবে তাহলেই রোগ মুক্ত বা রোগ নিয়ন্ত্রিত নিরাপদ মাংস উৎপাদন সম্পাদন করা সম্ভব হবে। এরূপ নিরাপত্তা নিশ্চিৎ হলে বিদেশে মাংস রপ্তানী করা যাবে।

এর পরেও নিরাপদ মাংস খাবার টেবিল পর্যন্ত নিরাপদ করতে আরও কিছু ধাঁপ পার করতে হবে। যেমন মাংস প্রসেসিং প্রক্রিয়া জীবানু মুক্ত পানি দ্বারা জীবানুমুক্ত স্থানে জীবানু মুক্ত টুলস দ্বারা সম্পন্ন করতে হবে। ফ্রিজিং তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। ভারী ধাতু মুক্ত ও ক্ষতিকর রংমুক্ত হলুদ, মরিচের গুড়া ও পানি ‍দিয়ে রান্না করতে হবে। সর্বশেষ হাইজিনিক পরিবেশে পরিবেশন করতে হবে। খাদকেরও ব্যক্তিগত হাইজিনিক অবস্থায় থেকে তা গ্রহণ করতে হবে তবেই নিরাপদ মাংস উৎপাদন সার্থক হবে।
ধন্যবাদ।

 

ডাঃ সুব্রত কুমার বাড়ৈ
ডি.ভি.এম,  এম.এস (বাকৃবি)
প্রাক্তন ফুড সেফটি এনালিস্ট, FAO

About Anik Ahmed

Check Also

ওজন কমায় ধনে পাতার রস

এগ্রিভিউ হেলথ ডেস্ক: খাবারের স্বাদ বাড়ানোর অনেক নামের একটি ধনে পাতা। রান্নার স্বাদ বাড়াতে ধনে পাতার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *