Thursday , October 18 2018
সর্বশেষ
Home / ক্যাম্পাস / প্রিয়মুখের সান্নিধ্যে

প্রিয়মুখের সান্নিধ্যে

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে এমন কয়েকজন শিক্ষক আছেন যারা ক্লাসে নিয়মিত পড়া ধরেন, পড়া না পারলে টুক-টাক বকা দেন; পরীক্ষার হলে কড়া গার্ড দেন । তারপরও উনারা সবসময়ই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকেন । হ্যাঁ কথা বলছি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব ডা. মো. মাহফুজুর রহমান মজনু স্যার সম্পর্কে । ক্যাম্পাসের অতি প্রিয় মজনু স্যারের সাথে কথা হচ্ছিল, কথা হচ্ছিল অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত নিয়ে । প্রিয় এই মানুষটার কথা গুলি তুলে ধরছি আজকের “প্রিয় মুখ” পাতায় ।

১. শিক্ষকতার শুরুটা কিভাবে ?

১৬ বছর আগে ফিরে যেতে হবে । আমি সিলেটে আসি ২০০১ সালে । আমাদের ১ম সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হবার ১৫ দিন পরে আমি প্রথম ক্লাসে আসি । ইতোমধ্যে আমার ভর্তি বাতিলের চিঠি অফিসে ইস্যু হয়ে ছিল, শুধু পাঠানো বাকি । এমন সময়ে আমি ক্লাসে হাজির । তখন শাহজাহান মজুমদার স্যারের বায়োস্ট্যাট ক্লাস হচ্ছিল । হাজিরা নেবার সময় যখন ৩৩ আইডি ডাকলেন আমি ইয়েস স্যার বললাম, স্যার থমকে গেলেন । অন্য কেউ ভুলে হাজিরা দিল কিনা তাই উনি আবারো ডাকলেন, আমি আবারো ইয়েস স্যার দিলাম । স্যার আরো কয়েকবার ডাকল, আমিও ইয়েস স্যার বলতে লাগলাম । স্যার বললেন তোমার তো ভপ্ররতি বালিল হয়ে যাবার কথা, তুমি এখনি অফিসে যোগাযোগ কর । অফিসে যেয়ে কর্মকর্তাদের বোঝাতে সক্ষম হলাম যে আমার কাছে ঠিকমত খবর না পৌছায় আমার আসতে দেরি হয়েছে ।

পরে শুরু করলাম পড়াশুনা । খুব নার্ভাস ছিলাম দেরিতে আসার কারনে, সবকিছুই অপরিচিত লাগল আমার কাছে । ১ম সেমিস্টারে রেজাল্ট খুব একটা ভালো করতে পারলাম না (চতুর্থ হই) । হাল ছাড়ার পাত্র আমি কখনই ছিলাম না, শুরু করলাম পড়াশুনা । এরপর থেকে প্রতি সেমিস্টারে (৩০১ কিংবা ৩০২ ছাড়া) প্রথম হলাম, অনার্স শেষে প্রথমই থাকলাম । মাস্টার্সে ভর্তি হবার আগে হল আরেক ভেজাল । রেজাল্ট না হওয়ায় ৫-৬ মাস অপেক্ষা করতে হল মাস্টার্সে ভর্তি হতে । ২০০৮ সালে ভর্তি হই আর শেষ হয় ২০০৯ সালের জুন মাসে । ততদিনে সিসিভেক সিকৃবিতে পরিনত হয় । বিশ্ববিদ্যালয় হবার পর আমরাই প্রথম ব্যাচ ছিলাম যারা অনার্স শেষ করি । একে তো বিশ্ববিদ্যালয় হল, রেজাল্টও ভালো ছিল আর সাথে পরিবারের চাওয়া সাথে নিজেরও মনে হল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারাটা সম্মানের ব্যাপার । এভাবেই ২০০৯ সালের ১৫ই নভেম্বর প্রভাষক হিসেবে আমি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি ।

২. ছোটবেলায় কি হবার স্বপ্ন দেখতেন ?

ছোটবেলা থেকেই মানুষের ডাক্তার হবার স্বপ্ন দেখতাম । এদেশের প্রেক্ষাপটে স্বভাবতই কেউ ভেটেরিনারিয়ান হবার স্বপ্ন দেখে না । আমার জন্ম ১৯৮০ সালের ৭ই ডিসেম্বর । পড়ালেখা পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (নিজ গ্রামেই), কলেজ শহীদ স্মৃতি ডিগ্রী কলেজ (আমার বড় ভাই বর্তমানে এই কলেজের প্রফেসর) । স্কুলে আমি ২য় ছিলাম, ১ম যে ছিল সে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল থেকে পাস করা ডাক্তার । চাকুরীর সুবাদে বাবা ঢাকা থাকতেন, গ্রামে আমরা ৫ ভাই এবং মা থাকতাম ।
আমাদের ৫ ভাইকে মানুষ করার জন্য আমার মা অনেক কষ্ট করেছেন এবং আল্লাহর রহমতে আজকে আমরা ৫ ভাই প্রতিষ্ঠিত ।
এইচএসসি শেষে মেডিকেলের কোচিং করতে ঢাকায় আসি আমি, কিছুদিন পর আমার বাবা মারা যান । মেডিকেলের জন্য সেভাবে আর প্রিপারেশন নিতে পারিনি । হলও না মেডিকেলে । পরে আমার সেজো ভাই বলেন যে সিলেট ভেটেরিনারি কলেজে ভর্তি হতে পারিস, টেকনিক্যাল সাবজেক্ট, খারাপ হবে না । পরীক্ষা দিলাম, চান্স পেলাম, আর সেখান থেকে আজকের আমি ।

৩. শিক্ষকতা জীবনে মজার কোন স্মৃতি ?

এখানে খুব মজার একটা ঘটনা আছে (হাসি) । আমার শিক্ষকরা কখনও জানতেন না যে আমি বিবাহিত, আমার বাচ্চা আছে । আমি মাস্টার্সে থাকা অবস্থায় আমি পারিবারিকভাবে বিওয়ে করি এবং ফ্যামিলির বাইরে এটা কেউ জানত না ,মাস্টার্স করা অবস্থায় সিলেটের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে (অক্সফোর্ড) শিক্ষকতা করি । যেদিন আমার সন্তান হয় সেদিন আমি সবাইকে ক্ষুদে বার্তা পাঠাই “Now I am a Father of a Son”. সবাই ভেবেছিল যে আমি দুষ্টামি করছি । পরে সবাইকে আমি বহু কষ্টে বোঝাতে সক্ষম হই যে আমি আসলেই বিবাহিত (আবার হাসি) ।

৪. এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেদিন জয়েন করলেন সেদিনের স্মৃতি ?
আমরা একসাথে প্রায় ১৮-২১ জন জয়েন করি । আমরা অপরাহ্ণে জয়েন করি । কিন্তু আমাদের জয়েনিং লেটার আসতে বিলম্ব হচ্ছিল । কখনও কারো নামে ভুল হচ্ছিল,কখনও কারো বাবার নামে ভুল আসতেছিল । আমরা সবাই খুব টেনশনে ছিলাম, বাসায় কেউ ফোন দিচ্ছি না, বাসার সবাইও খুব টেনশনে ছিল এই ভেবে যে সিন্ডিকেট হয়ে গেল, তাহলে চাকুরীটা হচ্ছে না ? ঠিক রাত ১১.৫০ মিনিটে আমাদের জয়েনিং লেটারটা হাতে এসে পৌছাল । বাসায় যাবার আগ পর্যন্ত আমার পুরা পরিবার খুব টেনশনে ছিল ।

৫. অবসর সময়ে কি করেন ?
অবসর খুব একটা পাওয়া হয়না । যতটুকু পাই পরিবার আর সন্তানকে সময় দেই । আর একজন শিক্ষককে সবসময়ই পড়াশুনার সান্নিধ্যে থাকতে হয় । যেহেতু আমি একজন গবেষক তাই গবেষনাতে সময় বেশিউ দিতে হয় এবং সাবজেক্ট ভিত্তিক পড়াশুনা করা হয় প্রায় সময়ই ।

৬. শিক্ষকতা থেকে অবসর নেবার পর কি করবেন ?
সেভাবে ভাবা হয়নি তবে দুস্থ মানুষের সেবা করতে চাই । তাদের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতা বিষয়ক কিছু যদি করতে পারি তাহলে আমি অনেক খুশি হব ।

৭. বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার জনপ্রিয়তাকে কিভাবে দেখেন ?
(হাসি) আসলে এটা সম্পর্কে আমি খুব একটা জানি না, আমার ছাত্র-ছাত্রীরাই হয়ত ভালো বলতে পারবে । আমি বিশ্বাস করি জ্ঞানদানের পরিবেশটা হবে বন্ধুত্বপূর্ন । আমি শিক্ষার্থীদের সাথে সর্বোচ্চ যোগাযোগের চেষ্ঠা করি । আসলে একটা ক্লাসে সবায় খারাপ স্টুডেন্ট না । একটা ক্লাসে ৫-৬ জন ছাড়া সবাই ভালো স্টুডেন্ট । আমি চিন্তা করি আমি যদি ৫-৬ জনকে ভালো করতে পারি, সবার উন্নতির পাশাপাশি এই ৫-৬ জনের উন্নতি করতে পারি তাহলে শিক্ষক হিসেবে এটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ।

৮. ২০ বছর পর এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান ?
আমি খুব আশাবাদী একজন মানুষ । আমি বিশ্বাস করি আগামী ২০ বছরের মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হবে । আসলে আমরা শিক্ষকরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্ঠা করে যাচ্ছি । যদি ল্যাব সুবিধা এবং মাঠ পর্যায়ের কাজ – এই দুটি সমন্বয় করে আমরা যদি শিক্ষার্থীদের কাছে পুরোপুরিভাবে পৌছাতে পারি তাহলে আমি বিশ্বাস করি সেরাদের সেরা হবার কাতারে খুব দ্রুতই আমরা পৌছাতে পারব ইনশাআল্লাহ ।

রিপোর্টার
আনোয়ারুল ইসলাম খোকন
(২২ তম ব্যাচ ডিভিএম, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)

About Mostafizur Rahman

Check Also

কালিগ্রাম থেকে উদ্ধারকৃত বিরল প্রজাতির সুন্ধি কাছিম পদ্মা নদীতে অবমুক্ত

শাহকৃষি তথ্য পাঠাগার নওগা হতে উদ্ধারকৃত বিরল প্রজাতির সুন্ধি কাছিমটিকে রাজশাহীর পদ্মা নদীতে অবমুক্ত করা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *