Monday , June 25 2018
Home / পোলট্রি / ডিবেকিং ছাড়া ব্রয়লার ব্রিডার পালন

ডিবেকিং ছাড়া ব্রয়লার ব্রিডার পালন

মুরগীর ঠোকরাঠুকরি (ক্যানাবলিজম) ও ফেদার পেকিং প্রতিরোধ করার জন্য অনেক আগে থেকেই মুরগীর ঠোঁট কাটার (ডিবেকিং) অনুশীলন চলে আসছে। ডিবেকিং মুরগীর বয়স যখন খুবই কম থাকে তখন করা হয় যা মুরগীর জন্য খুব বড় ধরনের স্ট্রেস এবং এটি মুরগীর জন্মগত অঙ্গ কেটে ফেলার কৃত্রিম পদ্ধতি।বিকল্প চিন্তা শুরু হয় কিভাবে ডিবেকিং ছাড়া মুরগী পালন করা যায় এবং ডিবেকিং এর যে উদ্দেশ্য ক্যানাবলিজম ও ফেদার পেকিং এর কারণে মৃত্যুহার ঠেকানো তাও বাস্তবায়িত হয়।
সফলতা আসলো, আসলো পূর্বের ধারণাতেও পরিবর্তন। দেখা গেল ডিবেকিং প্রকৃতপক্ষে ফেদার পেকিং বন্ধ করেনা, ফেদার পেকিং এর মাত্রাকে কমিয়ে দেয় মাত্র! পেকিং একটি জটিল বিষয়, যা শুরু হয় মুরগীর একটি স্বভাবজাত অভ্যাস “ঠোঁকর দেওয়া”,”আঁচড় কাটা” বা স্ক্র্যাচিং থেকে। ভাল ব্যবস্থাপনার (ম্যানেজমেন্ট) মাধ্যমে মুরগীর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রেখে, মুরগীর জন্য অনূকুল পরিবেশ সরবরাহ করে ডিবেকিং ছাড়াই ব্রীডার পালন করা সম্ভব এবং এটিই হবে উত্তম পদ্ধতি।

এ বিষয় অনুধাবন করতে পেরে উন্নত বিশ্বের দেশ যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ডিবেকিং ছাড়াই সফলতার সাথে ব্রীডার পালন করে আসছে। বাংলাদেশে পুরোপুরি এ ধারা চালু না হলেও অনেক বড় বড় ফার্ম তাদের কিছু ফ্লক ডিবেকিং ছাড়া পেলে দেখেছে বা দেখছে এবং কোন সমস্যাও পাওয়া যাচ্ছে না।নিচে ব্যবস্থাপনার বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা হল:

ক. ডিম পাড়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা (ম্যানেজমেন্ট ইন গ্রোয়িং/রেয়ারিং পিরিয়ড):

১. পরিবেশের ব্যবস্থাপনা: মুরগী যাতে ঠোঁকর(পেক) দিতে পারে এজন্য খড়, আলফালফা ঘাসের খড়, অথবা ঠোঁকর দেওয়ার মত অন্য কোন জিনিসের ছোট স্তূপ দেওয়া।মুরগীর বয়স ১৪ দিন হলেই এ জিনিসগুলো সরবরাহ করা যাতে মুরগী তার ঠোঁকর দেওয়ার মত জিনিস খুঁজে পায়।
২. খাবার ও পানি গ্রহণের জায়গা: সকল মোরগ-মুরগী যেন খাবার ও পানি গ্রহণের সময় প্রয়োজনীয় জায়গা পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা।নিচে ছকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করা হল:
এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, প্লাস্টিকের ফিডারের চেয়ে ধাতুর তৈরি ফিডার ব্যবহারে মনোযোগী হওয়া উচিত কারণ ধাতুর ফিডার প্রাকৃতিকভাবেই ঠোঁট কিছুটা ভোঁতা করে দেয়।
৩. পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত ঘরের (এনভাইরনমেন্টালি কন্ট্রোলড হাউস) জন্য প্রয়োজনীয় আলো নিচে ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলঃ

ফ্লুরোসেন্ট বাল্বের পরিবর্তে এল.ই.ডি বাল্ব ব্যবহার করা ভাল।

৪. মোরগ, মুরগীর সংখ্যা: মোরগ, মুরগীর সংখ্যা বেশি হলে খাবার ও পানি গ্রহণের জায়গা কমে যাবে, পেকিং শুরু হবে।
৫. লিটারের উচ্চতা ও ফ্লোর ফিডিং: রেয়ারিং (Rearing) এর সময় যদি মুরগীকে মেঝেতে খাবার দেওয়া হয় তাহলে লিটারের উচ্চতা সর্বোচ্চ ২ সে.মি. এর মধ্যেই রাখা ভাল।কারণ এতে মুরগী সহজে খাবার খুঁজে পাবে ও কংক্রিটের মেঝেতে ঠোঁকর লেগে প্রাকৃতিকভাবেই ঠোঁট ভোঁতা হবে।
৬. প্লাস্টিক/ধাতুর তৈরি ফিডার: ধাতুর তৈরি ফিডারের সুবিধা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।বর্তমানে প্যান ফিডার তৈরির কোম্পানিগুলো ধাতুর ভিত্তি দিয়ে ফিডার তৈরির চেষ্টা করছে যা ধাতুর ফিডারের মতই ঠোঁট ভোঁতা করার কাজ করবে।
৭. পরিবেশ: সর্বপরি সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পরিবেশ সরবরাহ করা যেখানে সঠিক তাপমাত্রা বজায় থাকে এবং বিশুদ্ধ বাতাস চলাচল করতে পারে।

খ. ডিম পাড়া অবস্থায় ব্যবস্থাপনা (ম্যানেজমেন্ট ইন লেয়িং পিরিয়ড):

রেয়ারিং এর সময় যে ব্যবস্থাপনা ছিল তা বহাল থাকবে এবং কিছু বাড়তি ব্যবস্থাপনায় মনোনিবেশ করতে হবে।রেয়ারিং ফার্ম থেকে যখন লেয়িং ফার্মে মোরগ, মুরগী ট্রান্সফার করা হয় তখন কিছু বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হবে। যেমন:

  • লেয়িং ফার্মের সকল ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকা
  • রেয়ারিং ফার্মের হাউজের পরিবেশ ও জিনিসপত্রের সাথে যতদূর সম্ভব লেয়িং ফার্মের হাউজের পরিবেশ ও জিনিসপত্রের মিল রাখা
  • পৌঁছানোর পরপরই যাতে মোরগ, মুরগী সহজে খাবার খুঁজে পায় সে ব্যবস্থা করা
  • গ্রোয়িং ফার্মে যদি মুরগী প্যান ফিডারে খেয়ে থাকে এবং লেয়িং ফার্মে যদি চেইন ফিডার সিস্টেম হয় তাহলে চেইন ফিডার এলাকায় জাল দিয়ে মোরগ, মুরগীগুলো প্রথম কিছুদিন আটকে রাখা
  • পৌঁছানোর পর কিছু অতিরিক্ত খাবার দেওয়া
  • লাইট স্টিমুলেশন দেওয়ার আগ পর্যন্ত রেয়ারিং হাউজের সমান তীব্রতার আলো দেওয়া
  • মুরগী নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে কিনা তার জন্য ক্রপ ফিল টেস্ট করা এবং মুরগীর খাবার ও পানি গ্রহণ লক্ষ্য করা
  • সবচেয়ে বেশি ভাল হয় ”অল ইন অল আউট” সিস্টেম হলে

# পুষ্টি:
⦁ সোডিয়াম: প্রয়োজনীয় পরিমাণ সোডিয়ামের চাইতে খুবই অল্প পরিমাণ সোডিয়াম কম হলেও পেকিং শুরু হতে পারে।তাই খাবারে ০.১৮-০.২০% সোডিয়াম সরবরাহ করতে হবে।
⦁ আমিষ: মুরগীর পালক ৮৯-৯৭% প্রোটিন! খাবারে আমিষ এবং অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড বিশেষ করে মিথিওনিন ও সিস্টিন এর অভাব হলে মুরগী ফেদার পেকিং শুরু করে দেয়।তাই খাবারে গুরুত্বপূর্ণ অ্যামাইনো এসিডগুলো পরিমাণে বাড়িয়ে দিতে হবে।
⦁ মিনারেল ও ভিটামিন: জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম পালক গঠনে ও পালকের গুনগত মান উন্নয়নে অবদান রাখে।ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স শরীরের মেটাবলিক প্রক্রিয়া ও পালক গঠনে সহায়তা করে।

#খাবার গ্রহণে সময়: মুরগী খাবার খুব দ্রুত খেয়ে ফেললে ফেদার পেকিং শুরু হবে।খাবার গ্রহণের সময় প্রয়োজনীয় পরিমাণ বৃদ্ধি করতে গ্রোয়িং এ বেশি আঁশযুক্ত ও কম শক্তিসম্পন্ন খাবার দিতে হবে।খাবারে ক্রুড ফাইবারের পরিমাণ নিচে ছকে দেখানো হল:

পিলেট বা ক্রাম্বল খাবারের পরিবর্তে মেশ খাবার দিলে খাবার গ্রহণের সময় বৃদ্ধি পাবে।

গ. যদি পেকিং দেখা দেয়:

উপরের আলোচনা অনুযায়ী ব্যাবস্থাপনা চালালে অধিকাংশ পেকিং বন্ধ হবে।তারপরও যদি কোন কারণে ফেদার পেকিং দেখা দেয় তাহলে নিচে বর্ণিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবেঃ

  • আলোর তীব্রতা কমিয়ে দিতে হবে।লাল আলো ব্যবহার করতে হবে।
  • বুঝতে হবে খাদ্য উপাদানে ঘাটতি হয়েছে।তাই খাবারে সোডিয়াম, মিথিওনিন ও ‍সিস্টিন এবং অন্যান্য অ্যামাইনো এসিডের সমন্বয় করতে হবে।
  • স্ক্র্যাচ ফিড, খড়, অর্ধপূর্ণ বোতল সরবরাহ করতে হবে।
  • প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম লবণ এবং প্রতিটি মুরগীর জন্য ০.০৫ গ্রাম তরল মিথিওনিন মেশাতে হবে

পরিশেষে বলা যায় ডিবেকিং ছাড়া ব্রয়লার ব্রিডার পালনের জন্য ভাল ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট।

 

লেখক পরিচিতিঃ –
কৃষিবিদ রুহুল আমিন মন্ডল
সিনিয়র ফার্ম ম্যানেজার,
নারিশ পোল্ট্রি এন্ড হ্যাচারী লিঃ।
ইমেইল: mramondol@gmail.com
মোবাইলঃ ০১৯১৯-৮৪১৮৭৩

About Editor

Check Also

ড.নিরঞ্জন কুমার সানাকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ায় বশেফমুবিপ্রবিতে আনন্দ মিছিল

বশেফমুবিপ্রবি প্রতিনিধি : বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ও প্রথম উপাচার্য নিয়োগ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *