Saturday , May 26 2018
সর্বশেষ
Home / পাঁচমিশালি / বাজারের ৭৫ শতাংশ দুধেই জীবাণু

বাজারের ৭৫ শতাংশ দুধেই জীবাণু

স্থানীয় বাজারের পাওয়া যাওয়া পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত। এসব ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে মলের জীবাণু ই-কোলাইও রয়েছে। তাই এসব প্যাকেটজাত দুধ সরাসরি বা কাঁচা অবস্থায় পানের জন্য নিরাপদ নয়। আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা সংস্থা আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় এ তথ্য জানা গেছে। সংস্থাটির গবেষকরা শিশুদের পুষ্টির প্রাথমিক উৎস বাণিজ্যিকভাবে পাস্তুরিত তরল দুধ নিয়ে গবেষণার পর এ অপ্রীতিকর ফলাফল পেয়েছেন। তবে প্যাকেটজাত ইউএইচটি দুধে এই ধরনের দূষণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

গবেষকদের মতে, দুগ্ধ খামার থেকে শুরু করে বিক্রয়ের দোকান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে দুধ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত থাকে—যা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। তবে, এটি শুধুমাত্র বিপজ্জনক হতে পারে যদি এই দুধ ‘কাঁচা’ (ফুটানো ছাড়া) অবস্থায় পান করা হয়।
কেয়ার বাংলাদেশের সহায়তায় ‘স্ট্রেনদেনিং দ্য ডেইরি ভ্যালু চেইন (এসডিভিসি)’ প্রকল্পের আওতায় বগুড়া, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, রংপুর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার মোট ১৮টি উপজেলায় এই গবেষণা পরিচালিত হয়। এই গবেষণার ফলাফল ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড মাইক্রোবায়োলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইসিডিডিআরবি।

গবেষণা প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, দুগ্ধ শিল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে দুধের অণুজীববিজ্ঞানগত মান যাচাই করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের দুধ উৎপাদনকারী, হিমাগার এবং স্থানীয় রেস্তোরাঁ থেকে কাঁচা দুধের ৪৩৮টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এছাড়াও, ঢাকা এবং বগুড়ার বিভিন্ন দোকান থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকৃত দুধের ৯৫টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষণাগারে এসব নমুনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে প্রাথমিক দুধ উৎপাদনকারী পর্যায়ে ৭২ শতাংশ ও ৫৭ শতাংশ নমুনা যথাক্রমে কলিফর্ম (≥১০০ সিএফইউ/এমএল) এবং ফিক্যাল কোলিফর্ম (≥১০০ সিএফইউ/এমএল) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত এবং নমুনাগুলোর ১১ শতাংশ উচ্চসংখ্যক ই. কোলাই (≥১০০ সিএফইউ/এমএল)  জীবাণু দ্বারা দূষিত। ফিক্যাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং দুধে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির ফলে বোঝা যায় যে দুধ জীবাণু বা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস দ্বারা দূষিত, যা উষ্ণ রক্তের প্রাণীর মলে থাকতে পারে বা দুধ দোয়ানোর সময় দুধে মিশতে পারে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, উৎপাদনকারীদের থেকে দুধ সংগ্রহের স্থানে দেখা যায়, নমুনাসমূহ উচ্চসংখ্যক কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া (≥১০০ সিএফইউ/এমএল) দ্বারা দূষিত এবং মল দ্বারা দূষিত হওয়ার হার ছিল ৯১ শতাংশ। এছাড়াও ৪০ শতাংশ নমুনায় উচ্চসংখ্যক ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, হিমাগারগুলো থেকে সংগ্রহ করা নমুনাগুলোতে দূষণের হার পাওয়া গেছে দুধ সংগ্রহের স্থানের নমুনাগুলোর চেয়েও বেশি পরিমাণে। পাঁচটি জেলার ১৫টি হিমাগারে সংগৃহীত নমুনাগুলোতে বিপুল পরিমাণ কলিফর্ম ও মলবাহিত কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার জীবাণু পাওয়া যায়। হিমাগার থেকে সংগ্রহ করা সবগুলো নমুনাতেই  ই. কোলাই  ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ৬৭ শতাংশ নমুনা ই. কোলাই দ্বারা উচ্চমাত্রায় দূষিত। এছাড়াও বি. সেরেয়াস এবং স্ট্যাফাইলোকক্কি-র মতো আরও কিছু ব্যাকটেরিয়া এসব নমুনায় পাওয়া গেছে। তবে এগুলোর মাত্রা ছিল স্বাভাবিক।

এ গবেষণায় দেখা গেছে, দুধ উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে হিমাগার এবং সবশেষে ভোক্তা অর্থাৎ স্থানীয় রেস্তোরাঁ পর্যায় পর্যন্ত দুধে ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা প্রতিনিয়ত বেড়েছে।

গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, পরীক্ষণ করা পাস্তুরিত দুধের নমুনার প্রায় ৭৭ শতাংশে মোট ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা (অ্যারোবিক প্লেট কাউন্ট) উচ্চমাত্রাবিশিষ্ট—যা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর মানদণ্ডকে (≤২.০০১০৪ সিএফইউ/এমএল) ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে, ৩৭ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ নমুনা যথাক্রমে কলিফর্ম এবং মলবাহিত কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত ছিল।

আইসিডিডিআরবি’র সহযোগী বিজ্ঞানী ও ফুড মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরির প্রধান এবং এই গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারের পাস্তুরিত কাঁচা দুধে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে এবং এসব দুধ খুব ভালোভাবে না ফুটিয়ে খাওয়া উচিত নয়। তবে,ইউএইচটি দুধ থেকে সংগৃহীত নমুনায় জীবাণুর সংক্রমণ দেখা যায়নি। এ কারণে এখন পর্যন্ত ইউএইচটি দুধ পানের জন্য নিরাপদ।’

তবে এই গবেষণায় দুধে রাসায়নিক পদার্থের দূষণ এবং ভেজাল মিশ্রণ-সংক্রান্ত পরীক্ষা করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

দুধের প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায়গুলো সম্পর্কে মন্তব্য করে ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন,‘দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি দেখে এটি স্পষ্ট বোঝা যায় যে, দুধের মূল গুণ অর্থাৎ এর পুষ্টিগত গুণাগুণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের গবেষণা থেকে দেখা গেছে,দুধের প্রাথমিক উৎপাদনকারী পর্যায়ে এর দূষণের সঙ্গে গরুর প্রজনন প্রক্রিয়া, গরুর দ্বারা উৎপাদিত দুধের পরিমাণ,দুধ দোয়ানোর সময় এবং যিনি দুধ দোয়ান তার হাত ধোয়ার অভ্যাসের মতো বিভিন্ন বিষয় জড়িত। সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর দুধ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্বাস্থ্যকরভাবে দুধ দোয়ানো, সংগ্রহ ও সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং পাস্তুরিত করার বিষয়ে যত্নবান হতে পরামর্শ দিচ্ছি। এছাড়াও,পানের জন্য দুধকে নিরাপদ রাখতে দুধ উৎপাদনের স্থান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পাস্তুরিত দুধকে নিরবচ্ছিন্নভাবে শীতল রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।’

প্যাকেটজাত দুধের এই হাল হওয়ায় সাধারণভাবে উৎপাদিত দুধেও এমন জীবাণুর উপস্থিতির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে এ ধরনের নমুনা এই গবেষণার আওতাধীন ছিল না বলে জানা গেছে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

About Anik Ahmed

Check Also

বাকৃবিতে জুলাই-ডিসেম্বর সেমিস্টারে এম.এস. কোর্সে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই-ডিসেম্বর সেমিস্টারে এম.এস. কোর্সে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে ।  গত ১৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *