Tuesday , November 13 2018
Home / কৃষি গবেষনা / তুলার পাতার কোনাচে দাগ বা কালো ডাটা বা ফল পচা রোগ

তুলার পাতার কোনাচে দাগ বা কালো ডাটা বা ফল পচা রোগ

তুলা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ছিল তুলা চাষের জন্য প্রসিদ্ধ। ঢাকা জেলার তুলা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। এ তুলার সুতা থেকেই তৈরী হতো ঢাকাই মসলিন। প্রাচীনকাল থেকেই চীন, ভারত ও মিশরে তুলার ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ তুলা বস্ত্র তৈরীর জন্য ব্যবহৃত হয়। বাকি ২৫ শতাংশ কার্পেট, পর্দা, গৃহস্থালির রকমারি জিনিস তৈরীর জন্য এবং অবশিষ্ট তুলা শিল্পের বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তুলার বীজ থেকে তেল ও খৈল পাওয়া যায়। তুলাবীজ থেকে প্রাপ্ত পরিশোধিত তেল ভোজ্যতেল ও অপরিশোধিত তেল সাবান তৈরীর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তুলা বীজের খৈল গবাদিপশু ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রোগ বালাই তুলা উৎপাদনের একটি প্রধান প্রতিবন্ধক। এই রোগসমূহ নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারলে তুলার ফলন অনেক বৃদ্ধি পাবে। তাই নিন্মে তুলার মারাত্মক একটি রোগের লক্ষণ, কারন, বিস্তার ও প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

 

 পাতার কোনাচে দাগ বা কালো ডাটা বা ফল পচা রোগ

(Angular leaf spot/Bacterial blight/Vein blight or Black arm or Boll rot)

 

রোগের কারণঃ জ্যান্থোমোনাস ক্যামপেস্ট্রিস পিভি. মালভেসিয়ারাম (Xanthomonas campestris pv. malvacearum) নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমনে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ

ব্যাকটেরিয়া বীজের উপরে ও ভিতরে অথবা শস্যের পরিত্যক্ত অংশে অবসর যাপন করে। বৃষ্টি, পানির ছিটা, পানি নিস্কাশন, পানি সেচ, এমন কি কৃষকের দেহের সংস্পর্শে এসে ব্যাকটেরিয়া গাছের আক্রান্ত অংশ থেকে সুস্থ অংশে ছড়িয়ে পড়ে।  অধিক আর্দ্রতা ও মাঝামাঝি উষ্ণতা (২৪০ সেঃ) রোগটির বৃদ্ধির সহায়ক।

রোগের লক্ষণঃ রোগের লক্ষণ চারটি অবস্থাতে প্রকাশিত হয়, যথা-চারায়, পাতায়, শাখা-প্রশাখা ও ফলে।

১। চারা ধ্বসা (Seedling blight)

  • অংকুরোদগমের পরে শল্কপত্রে দাগ দেখা দেয়।
  • তলার দিকের দাগগুলো ছোট গোলাকৃতি ও পানি ভেজার মত দেখা যায়।
  • পরে বিভিন্ন ধরণের কোনাচে দাগের আকারে হয়।
  • দাগগুলো বাদামী রং-এর হয়।
  • শল্কপত্র বিকৃত হয়ে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া শিরা দিয়ে পাতার বোটা ও কান্ডে বিস্তার লাভ করে।
  • এর ফলে পাতা শুকিয়ে যায়।

২। পাতায় কোনাচে দাগ (Bacterial blight/Angular leaf spot/Vein blight)

  • পাতায় ছোট ছোট পানি ভেজার মত ত্রিকোনা ও চৌকোনা দাগ হয়।
  • দাগ প্রথমে পাতার তলায় পিঠে দেখা গেলেও পরে উপরের পিঠেও দেখা যায় এবং  মধ্যশিরা ও প্রধান উপশিরা বরাবর বাড়তে থাকে।
  • শিরাগুলো বাদামী রং ধারণ করে কুঁকড়ে ভিতরের দিকে বেঁকে আসে।
  • পাতার দাগগুলো ক্রমেই বড় হয় এবং প্রথমে বাদামী ও পরে কালো রং ধারণ করে।
  • আক্রান্ত অংশ থেকে ব্যাকটেরিয়া পুঁজ আকারে বের হতে থাকে।
  • বেশী আক্রান্ত পাতা মরে যায় ওঝরে পড়ে।।

৩। কালো ডাটা পচা (Black arm)

  • শাখা-প্রশাখাগুলোতে কালো কালো দাগ দেখা দেয়।
  • দাগগুলো একত্রে মিশে কালো বসে যাওয়ার মত হয়।
  • এই কালো বসা দাগগুলো গোটা কান্ডকে ঘিরে ফেলে।
  • প্রধান কান্ডেও এধরণের লক্ষণ দেখা যায়।
  • আক্রান্ত শাখাগুলো শুকিয়ে গেলে পাতা চুপসে ঝুলে থাকে।

৪। ফল পচা (Boll rot)

  • ফলের সবুজ গায়ে প্রথমে ছোট ছোট পানি ভেজা দাগ উৎপন্ন হয়।
  • দাগগুলো পরে গাঢ় বাদামী ও কালো হয়ে কিছুটা গর্তের সৃষ্টি করে।
  • ছোট অবস্থাতে ফলে বেশী ক্ষত হলে তা ঝরে পড়ে।
  • ফলের  আকার ছোট হয়ে যায় এবং ভিতরের তুলার আঁশও ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

 

রোগের প্রতিকারঃ

  • রোগমুক্ত এলাকার সুস্থ বীজ বপন করতে হবে।
  • তুলা সংগ্রহের পর আক্রান্ত গাছের অংশ উত্তমরূপে পুড়ে ফেলতে হবে।
  • সালফিউরিক এসিড দ্বারা বীজ শোধন করে লবন গুলা পানিতে ধুয়ে আবার পরিস্কার পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে।
  • ১০০ পিপিএম স্ট্রেপ্টোমাইসিন সালফেট দ্রবনে বীজ সারা রাত ভিজিয়ে রেখে শুকিয়ে জমিতে বপন করতে হবে।
  • আক্রান্ত চারা বা গাছ দেখা মাত্র মাটি সহ তুলে ধ্বংস করতে হবে।
  • ট্রাই ব্যাসিক কপার সালফেট (কিউপ্রোক্স্যাট ৩৪৫ এসসি) ১ লিটার পানিতে ৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার জমিতে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
  • ব্যাকটেরিয়া নাশক  স্ট্রেপ্টোমাইসিন সালফেট + টেট্রাসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড (ক্রোসিন-এজি ১০ এসপি) প্রতি লিটার পানিতে ০.৮ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার জমিতে গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।

বি:দ্র: ক্রোসিন-এজি ১০ এসপিও কিউপ্রোক্স্যাট ৩৪৫ এসসি ঔষধ দুইটি পর্যায়ক্রমে একটা ব্যবহার করার পর আরেকটি ব্যবহার করতে হবে।

 

বিজ্ঞানী ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান
উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব)
মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই
শিবগঞ্জ, বগুড়া, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ ০১৯১১-৭৬২৯৭৮
ইমেইলঃ zaman.path@gmail.com

About Editor

Check Also

ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন

বাকৃবি প্রতিনিধি : প্রথমবারের মতো বিশ্বখ্যাত ছোট জাতের ছাগল ব্ল্যাক বেঙ্গলের পূর্ণঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন  করা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *