Thursday , November 15 2018
সর্বশেষ
Home / পাঁচমিশালি / কবুতর পালনের এ টু জেড…

কবুতর পালনের এ টু জেড…

ভালোবাসার ডাকপিয়ন, সৌন্দর্য্যের প্রতীক কিংবা শান্তির বার্তাবাহক; একটা পাখির কত নাম । বর্তমান যুগে চিঠি আদান প্রদানে কবুতর ব্যবহার হয় না আবার শান্তির প্রতীক সেটাও বর্তমান যুগের সাথে যায় না । যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন নামে কবুতর কে ডাকা হলেও “সৌন্দর্য্যের প্রতীক” এই নামটা পূর্বে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে ।

শখের বশে কিংবা বানিজ্যিক ভিত্তিতে কবুতর পালন করতে চাইলে জেনে নিতে পারেন কবুতর পালনের এ টু জেড ।

১. বাসস্থানঃ
দেশী বা গোলা কবুতর খুব সহজে পালন করা যায়। প্রথমে আপনাকে কাক, বিড়াল, বৃষ্টির জল এসব থেকে মুক্ত একটি জায়গা বেছে নিতে হবে। বাড়ির ছাদে বা দেয়ালে কবুতরদের জন্য ঘর স্থাপন করতে হবে। মিস্ত্রি দ্বারা ছোট ছোট কাঠের বাক্স তৈরি করে নিবেন। মনে রাখবেন প্রতি জোড়া কবুতরের জন্য ২ টি ঘর বরাদ্দ রাখবেন। এর কারণ হল, অনেক কবুতর আছে যারা বাচ্চা থাকা অবস্থায় আবার ডিম দেয়, তাই ২ টি ঘর দরকার হয়। প্রতিটা ঘরের মাপ বেশ বড় রাখবেন। সকল ঘরের সামনে প্রশস্ত ল্যান্ডিং স্পট রাখবেন, প্রতি দুটো ঘর পর পর ল্যান্ডিং স্পটের উপরে একটি ব্যারিকেড দিবেন যাতে পাশাপাশি কবুতর জোড়ার মধ্যে ঝগড়া না হয়।
সবচেয়ে ভাল হয় কবুতর দের জন্য একটি আলাদা বড় ঘর করা। ঘরটা হতে পারে ১৫০ x ৮০ বা ১৫০ x ১০০ ইঞ্চি অনুপাতে। ঘরটি বাড়ির ছাদেও হতে পারে বা বাড়ির সামনেও হতে পারে। ঘরে ঢালাই ছাদ দিলে সবচেয়ে ভাল। এছাড়া সিমেন্টের টিন বা টালি দেয়া যেতে পারে যাতে ঘরের ভেতর সূর্যের তাপ খুব বেশি না হয়। টিনের মধ্যে একটি নীল স্বচ্ছ টিন দিবেন এতে ঘরে আলো আসবে ভাল। ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস যেন থাকে সেজন্য ঘরের যেকোনো ২ টি দেয়ালে বড় নেট দিবেন, এতে বাতাস চলাচল করবে। এটা ছাড়াও ঘরের উপরে চার দেয়ালেই ভেন্টিলেটর দিবেন। আমরা বেশীরভাগ সময় কবুতরের ঘর স্বাস্থ্যসম্মত করতে পারিনা বলে খুব সহজে কবুতর রোগাক্রান্ত হয়। যারা গ্রামে থাকেন, তাঁরা অবশ্যই এই রকম বড় ঘরের মধ্যে কবুতর পালন করবেন, কেননা গ্রামে অনেক অসৎ চাষি জমিতে গম ও সরিষা লাগানোর সময় বীজে বিষ মেশায় যা খেয়ে কবুতর মারা যায়। এই সময় কবুতরদের নিরাপদে রাখার জন্য কবুতরদের ছেড়ে দেয়া যাবেনা ।

২. কবুতর নির্বাচনঃ
কবুতর কেনার ব্যাপারে আপনাকে খুব সজাগ থাকতে হবে। আপনাকে অবশ্যই দেখে ও বুঝে রোগমুক্ত কবুতর কিনতে হবে। গোলা কবুতর নিজেরা নিজেদের খাবার সংগ্রহ করে খেতে ভালবাসে, তাই তারা বাড়ির আসে পাশে ঘুরে বেড়ায় আর এজন্য কোন অবস্থাতেই বাড়ির আসে পাশে থেকে কবুতর কিনবেন না, কাছাকাছি জায়গা থেকে কবুতর কিনলে কবুতর আগের বাড়িতে চলে যাবে। নিজ থানার বাইরে থেকে কবুতর কিনতে হবে। নবীন দেখে কবুতর কিনবেন। বেশি বয়সের কবুতরে সমস্যা থাকতে পারে। নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়া কোন জায়গা থেকেই জড়াসই কবুতর কিনবেন না। সমস্যা ছাড়া জোড়াসই কবুতর বাজারে কেউ বিক্রি করেনা। সবচেয়ে ভাল হয় জোড়াবিহীন কবুতর কিনে নিজে জোড়া দিয়ে নেয়া ।

৩. পালন পদ্ধতিঃ
বাজার থেকে কবুতর আনার পর প্রথম কাজটা হবে কবুতরকে পরিষ্কার করা। এর জন্য আপনি শুধু পানি দিয়েই স্প্রে করে গোসল করে দিতে পারেন। যদি পারেন তবে পানির সাথে পরিমাণ মতো জীবাণুনাশক যেমন ডেটল বা এ জাতিও কিছু মেশাতে পারেন। কবুতরের চোখে বা কানে যেন পানি না লাগে খেয়াল করবেন। এভাবে গোসল করানোর পর কবুতরগুলোকে ২/৩ দিন আলাদা করে রেখে দিন, এতে জীবাণু মরে যাবে। তারপর আপনি সেগুলোকে আপনার লফটে আনবেন। যদি আপনার লফটে আগে থেকে কোন কবুতর না থাকে বা এটাই যদি শুরু হয় তবে সরাসরি লফটে রাখবেন। এর কবুতর লফটে নেয়ার আগে আপনার পুরো লফট জীবাণুনাশক দিয়ে আগে থেকে স্প্রে করে প্রস্তুত করে রেখে দিবেন [কবুতরের ঘরসমূহকে লফট (Loft) বলা হয়)] ।

৪. বাড়ি চেনানোঃ
বাড়ি চেনানো অনেকের কাছে জটিল একটা বিষয় মনে হতে পারে আসলে এটা তেমন জটিল কোন কাজ না। পাখিদের ভেতর কবুতর খুব সহজে নিজের ঘর চিনে নিতে পারে। আপনি যে খোপে কবুতর রাখবেন সেই খোপে কবুতরকে ১০-১২ দিন আটকিয়ে রাখুন। এমনভাবে আটকিয়ে রাখুন যাতে কবুতরগুলো খোপের ভেতর থেকেও সামনের সবকিছু দেখতে পায়। খোপের সামনে অস্থায়ী ভাবে নেট লাগিয়ে দিয়ে এটা করতে পারেন। নেট এর ভেতরে খাবার ও পানি সরবরাহ করবেন নিয়মিত। ১২ দিন এভাবে চলার পর নেট টা খুলে দিবেন। ইনশাল্লাহ কবুতর ঘর চিনে যাবে।
এছাড়া কবুতর ছেড়ে দিয়েও বাড়ি চেনানো যায়। এতে কবুতরের পাখা টেপ দিয়ে বেধে দিতে পারেন। তবে এভাবে ছেড়ে দিলে কবুতর দের খুব দেখেশুনে রাখতে হয় কারণ এরা তখন উড়তে পারেনা বলে বিড়াল বা কুকুর বা মুরগি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। কবুতর পালন করতে গেলে আপনার মনটাকে অবশ্যই বড় করতে হবে। ২-১ টা কবুতর হারিয়ে গেলে বা মারা গেলে আপনাকে সহজ মনে মেনে নিতে হবে।

৫. খাবারঃ
খাবার হিসেবে প্রচলিত খাবারই খাওয়াবেন। দেশী কবুতর ধান খুব পছন্দ করে। আপনি ধান, চালের খুদ একত্র করে খাওয়াবেন। মাঝে মাঝে গম ও সরিষা খাওয়াতে পারেন। বাজারে বিভিন্ন ধরণের ফিড পাওয়া যায় । কোয়েল বা লেয়ার মুরগির জন্য বাজারে যে ফিড পাওয়া যায় সেটা খাওয়ার অভ্যাস যদি কবুতরদের করতে পারেন তবে ভাল ফলাফল পাবেন। আপনি যাই খাওয়ান না কেন খাবার অবশ্যই শুঁকনো ও পরিষ্কার হতে হবে। খাবারগুলো রোদে শুকিয়ে রাখবেন। খাবারের জন্য আলাদা পাত্র রাখবেন। বাজারে মুরগির জন্য যে পাত্র পাওয়া যায় সেটাই কবুতরের জন্য ব্যবহারযোগ্য। পানির জন্য আলাদা পাত্র পাওয়া যায়, সেটা কিনে নিবেন। পানিতে যেন কবুতরের বিষ্ঠা না পরে খেয়াল রাখবেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পানির সাথে বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেল খাওয়াতে পারেন । সপ্তাহে অন্তত ২ বার পাখিদের গোসল করার জন্য পানি দিতে হবে।

কবুতর পরিচিতিঃ
আমাদের চারদিকে যে কবুতর গুলা সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায় তাদের মাঝে গোলা বা গোবিন্দ অন্যতম । এরা দেশী কবুতর নামেও পরিচিত।

গোলা কবুতরের বৈশিষ্ট্যগুলো হলঃ
১. এদের আকার মাঝারি ধরণের হয়; খুব ছোট না, বড় না।
২. ঠোট একটু লম্বাটে, অক্ষিগোলক কালো বা হলুদ হয়।
৩. পায়ে সাধারণত পালক থাকেনা। তবে কিছু কবুতরের হালকা পালক থাকতে পারে। মাথায় খোপা থাকতে পারে।
৪. এরা বিভিন্ন রঙের হতে পারে। তবে পুরোপুরি কালো গোলা কবুতর দেখা যায়না।
৫. এরা প্রচুর পরিশ্রমী কবুতর। এদের যত্ন না নিলেও এরা ভালো থাকে। এরা নিজেই নিজেদের খারার সংগ্রহ করতে পারে।
৬. এদের বাচ্চা উঠানোর হার খুব ভালো তাই বিদেশী কবুতরের বাচ্চা এদের দ্বারা উঠানো হয়।
৭. কবুতরের মাংস হিসেবে এই কবুতরের বাচ্চাই খাওয়া হয়।
৮. বর্তমান বাজারে এদের দাম জোড়া প্রতি অনূর্ধ্ব ৫০০ টাকা। খাওয়ার জন্য বাচ্চা প্রতি জোড়া ১৫০-১৮০ টাকা।

কবুতরের ডিম নিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্যঃ
১. বাচ্চা কবুতর জোড়া যদি নর ও মাদি হয় এবং ভাল খাবার পায় তবে ৫ মাসের মধ্যে এরা প্রথম ডিম দেয়।
২. কবুতর সর্বোচ্চ ৭ মাসের মধ্যে প্রথমবার ডিম দেয়।
৩. শুরুতে অনেক কবুতর একটা ডিম দিতে পারে।
৪. একটি ডিম দেয়ার পরদিন গ্যাপ রেখে তার পরদিন বাঁকি ডিমটি দেয়।
৫. খুবই ব্যতিক্রমী ব্যাপার হল, কবুতর তিনটা ডিমও দিতে পারে! এক্ষেত্রে তৃতীয় ডিমটা কিছুটা ছোট হয়।
৬. প্রথম ডিম দেয়ার পর কবুতর ওই ডিমের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা দেয়না। এতে আপনি বুঝবেন কবুতরটি দ্বিতীয় ডিম দিবে। যদি দেখেন প্রথম ডিমে প্রথম থেকেই তা দিচ্ছে তবে বুঝবেন কবুতর সেবার আর ডিম দিবেনা।
৭. অনুকূল পরিবেশ, ভাল খোপ ও খাবার পেলে অধিকাংশ জাতের কবুতর প্রতি ৫০ দিনের মধ্যে দুবার ডিম দেয়।
৮. ডিমে তা দেয়া শুরুর ৫ দিন পর দুটো ডিম লাইটের আলোতে ধরে দেখবেন। যদি কোন ডিম না জমে তবে তা সরিয়ে ফেলবেন। শুধু এই কারণে আপনি ডিমে এই একবারই হাত দিবেন। অযথা ডিমে হাত দিবেন না, ঝাকাঝাকি করবেন না। ডিমে পরীক্ষা করার আগে অবশই হাত ভালভাবে ধুয়ে নিবেন।
৯. ডিমে হাত দিলে বাচ্চা হয়না এটা ভুল ধারণা।
১০. চাইলে আপনি এক সপ্তাহ ফ্রিজে ডিম রেখে দিয়ে অন্য কবুতর দ্বারা বাচ্চা ফুটাতে পারেন। এক্ষেত্রে ফ্রিজ থেকে বের করার পর ডিমের স্বাভাবিক তাপমাত্রা হলে কবুতরের নীচে দিতে হবে। ডিম দেয়ার সাথে সাথেই ডিম সংরক্ষণ করতে হবে।
১১. কবুতরের ডিম ফোটে সাধারণত ১৮ দিনে।
১২. কবুতর ১৮ দিনের বেশি ডিমে তা দেয় না। তাই ডিম অদল বদলের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন যে ডিমগুলো বদল করবেন তা ১৮ দিনে বা তার আগেই যেন বাচ্চা ফোটে।
১৩. ডিমে যদি কবুতরের বিষ্ঠা লেগে যায় তবে তা কখনো উঠাতে যাবেন না, উপরের খোসা উঠে যেতে পারে।
১৪. কবুতরের ডিমের খোসা মোটা করার উপায় হল মুরগির ডিমের খোসা গুঁড়ো করে নিয়মিত সব কবুতরকে খাওয়ানো।

About Editor

Check Also

পেঁপে চাষের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি…

পেঁপে বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান ফল। কাঁচা পেঁপে সবজি হিসেবে এবং পাকা পেঁপে ফল হিসেবে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *