Wednesday , April 25 2018
সর্বশেষ
Home / কৃষি বিভাগ / বাংলাদেশে লাক্ষা চাষ : শিল্পসুযোগ ও সম্ভাবনা 
Photo Courtesy: দীপ্ত কৃষি

বাংলাদেশে লাক্ষা চাষ : শিল্পসুযোগ ও সম্ভাবনা 

নূর-ই-কুতুবুল আলম, খুবি প্রতিনিধিঃ  “পোকা” নামটি আমাদের অনেকের কাছেই অতি বিরক্তের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে পোকাদের মাঝেই ছড়িয়ে আছে কিছু উপকারী পোকা যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানান ভাবে সহায়তা করে থাকে। তেমনই লাক্ষা পোকা (Lac Insect) একটি ক্ষুদ্র আকৃতির উপকারী পোকা যা রেজিন জাতীয় পদার্থ নিঃসরণ করে থাকে। লাক্ষা পোকার ত্বকের নিচে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা একপ্রকার গ্রন্থি থেকে আঠালো রস নিঃসৃত হয়, যা ক্রমান্বয়ে শক্ত ও পুরু হয়ে পোষক গাছের ডালকে আচ্ছাদিত করে ফেলে।মূলত পোষক গাছের ডালের এই আবরণকে লাক্ষা বা লাহা নামে অভিহিত করা হয়।

দেশের প্রেক্ষাপটে লাক্ষা চাষের সুবিধাসমূহ

লাক্ষা চাষ আমাদের দেশের আবহাওয়ায় বেশ উপযোগী। ফলে দেশের যেকোনো স্থানে লাক্ষা চাষ করা সম্ভব। কেবলমাত্র অতিবৃষ্টি আর অনাবৃষ্টি লাক্ষা চাষ বাধার সৃষ্টি করে থাকে। লাক্ষা চাষের সবচেয়ে সুবিধাজনক দিক হচ্ছে এর জন্য পৃথক কোন চাষের জমির প্রয়োজন পড়েনা। যে সকল প্রজাতির গাছে লাক্ষা ভাল জন্মায় সেগুলোকে লাক্ষার পোষক গাছ বলা হয় যেমন মালবেরি অন্যতম। লাক্ষার পোষক গাছসমূহ জমির আইল, বাড়ির আশেপাশে, রাস্তা ও রেল লাইনের পাশে লাগানো যায়। বাংলাদেশে বরই, বাবলা, কড়ই প্রভৃতি গাছে লাক্ষা ভালো জন্মে। তবে বরই/কুল গাছকে (বৈজ্ঞানিক নাম Ziziphus jujuba) সাম্প্রতিক সময়ে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, কারণ বরই গাছে খরচ কম এবং বাড়তি যত্নের প্রয়োজন পড়ে না।

সম্প্রতি দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে লাক্ষা চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পূর্বে শুধুমাত্র নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বিরোদপুর, মনাকষা ও দাদনচক লাক্ষা চাষের আদি এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডমালা এবং পোরশা ও সাপাহার উপজেলা এলাকাতেও লাক্ষা চাষ করা হচ্ছে। সচরাচর স্থানীয় চাষিরাই বীজলাক্ষা সংরক্ষণ করে থাকেন।

চরাঞ্চলে লাক্ষা চাষের অপার সম্ভাবনা

সম্প্রতি SANFEC (South Asian Network Food Ecology & Culture) পরিচালিত U D (Using Diversity Research Awards Program) গবেষণা রিপোর্টে যমুনার চর এলাকায় লাক্ষা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ রিপোর্টে বলা হয়, গাইবান্ধার ফুলছড়ি থেকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রায় ১৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যমুনা নদীর মাঝে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। জেগে ওঠা কিছু কিছু চর এলাকায় বসবাস করছে হাজার হাজার প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক পরিবার। জেগে ওঠা চরাঞ্চলে বরই গাছ লাগিয়ে লাক্ষা চাষের রয়েছে অপার সম্ভাবনা।

এরকম পরিবেশে বরই গাছের সুবিধাজনক দিক হচ্ছে এটি আপনজালা উদ্ভিদ (নিজ থেকে জন্মে) এবং বন্যার পানিতে মারা যায় না। বরই গাছ চরাঞ্চলে লাগালে সেখানকার ভূমি কৃষি উপযোগী হয়ে উঠবে। এতে সেখানকার কৃষকেরা লাক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য ফসলও ফলাতে পারবেন সহজে। চরগুলোতে লাক্ষা চাষ সম্প্রসারনের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করা যাবে। পশ্চিমা দেশসমুহের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ও কাঠের আসবাবপত্র বার্নিশের কাজে ব্যাপকভাবে লাক্ষার ব্যবহার হওয়ায় উক্ত দেশগুলোতে একটি বড় লাক্ষার বাজার রয়েছে, সেখানে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

লাক্ষার ব্যবহার

১. বিভিন্ন ধরনের বার্নিশ তৈরী ও পিতল বার্নিশ করার কাজে
২. অস্ত্র ও রেলওয়ে কারখানায়, বৈদ্যুতিক শিল্প কারখানায় অপরিবাহী বার্নিশ পদার্থ হিসেবে
৩. চামড়া রং করার কাজে, স্বর্ণালংকারের ফাঁপা অংশ পূরণে
৪. লবণাক্ত পানি হতে জাহাজের তলদেশ রক্ষা করার কাজে বার্নিশ হিসেবে
৫.ডাকঘরের চিঠি,পার্সেল ইত্যাদি সীলমোহর কাজে
৬.লাক্ষার আবরণযুক্ত কয়লা অত্যন্ত উঁচু স্থানসমূহে রান্নার কাজে
৭.লাক্ষার বিভিন্ন উপাদান পারফিউম প্রস্তুতির পাশাপাশি পোকার যৌন আকৃষ্টকরণ পদার্থ (Sex pheromone) তৈরীতে এবং অনেক ঔষধ প্রস্তুত করার সহায়ক রাসায়নিক তৈরিতে প্রয়োজন পড়ে।

অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনের তুলনায় কেমন আয় হয়?

প্রতিবছর দুটি মৌসুমে চাষ হয় এই লাক্ষা। একটি কার্তিক মৌসুম অন্যটি বৈশাখ। তবে বৈশাখ মৌসুমে ফলন বেশি। বরই গাছে লাক্ষা চাষ করলে বরইয়ের ফলন ২৫% কমে গেলেও লাক্ষার দামের তুলনায় ব্যাপক লাভ হয়। এই চাষ ব্যবস্থায় এক ফুট করে বীজলাক্ষার জন্য ডাল কাটা হয়। ৫০টি বীজলাক্ষার ডালকে এক তুড়ি বলে। জানা যায়, এক তুড়ি ডাল ১০০০-১৫০০ টাকায় বিক্রি হয় নবাবগঞ্জে অবস্থিত লাক্ষা গবেষণাকেন্দ্র হতে।

About Nur E Kutubul Alam

Check Also

পাহাড়ের কাজু বাদাম এখন জমিতে!

এগ্রিভিউ২৪ ডেস্কঃ বাংলাদেশে প্রথম কাজু বাদাম হত পাহাড়ী এলাকায়। অন্য কোথাও তেমন দেখা যেতনা। তাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *