Sunday , April 22 2018
Home / প্রথম পাতা / মাছ চাষে প্রাকৃতিক সুরক্ষা – ১ম পর্ব

মাছ চাষে প্রাকৃতিক সুরক্ষা – ১ম পর্ব

মাছ চাষে  গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গুলোর মধ্যে  অন্যতম হচ্ছে রোগ প্রতিরোধক অথবা প্রতিষেধক হিসেবে বিভিন্ন ওষুধের ব্যবহার। আমি ওষুধের ভূমিকাকে খাবারের ভুমিকার চেয়ে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ মনে করি কারন আপনি আপনার পুকুরে ৩ দিন খাবার প্রয়োগ না করলে হয়ত মহামারী আকারে মাছ মারা যাবে না কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধ ব্যবহার না করলে আপনার বহু বছরের কষ্টার্জিত ফলাফল একদিনেই ধংস হয়ে যেতে পারে। তাই এই বেপারটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই বেপারটাকে পুজি করে ব্যাঙের ছাতার মত আমাদের দেশে অসংখ্য ড্রাগস কোম্পানি গজিয়ে উঠেছে যারা কোন সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিত ভাবে কেমিক্যাল ড্রাগস খামারিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন আর আমরাও না বুঝে তাদের ফাঁদে পা দিয়ে আমাদের মাছ চাষের ভবিষ্যৎ কে অনিশ্চয়তার মদ্ধে ফেলে দিচ্ছি।

সৃষ্টিকর্তার অনেকগুলোর মধ্যে সবথেকে বড় নেয়ামত হচ্ছে উনি যেমন রোগ সৃষ্টি করেছেন তেমনি রোগের চিকিৎসা হিসেবে প্রকৃতির মাধ্যমে অনেক উপাদান আমাদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন । কিন্তু আমরা ওইসব নেয়ামত কে গ্রহন করার ব্যাপারে অনেক কার্পণ্য বোধ করি। অথচ সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ কিন্তু প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত ওষুধ গুলোকেই নিজেদের কাজে ব্যবহার করত এবং মানুষ সব থেকে দীর্ঘায়ু লাভ করত তখন। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও একই। একটা অবলা প্রানী তার পেটে ব্যথার  কথা আমাদের কাছে প্রকাশ করতে পারে না কিন্তু সে নিজেও কিন্তু প্রকৃতি থেকে তার নিজের ঔষধ নিজে সংগ্রহ করে নিচ্ছে।

একটা কুকুর অথবা বিড়ালের পেটে ব্যথা হলে দেখা যায় যে নিজে গিয়েই গাঁদা ফুলের পাতা চিবিয়ে খাচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা সব প্রাণীকে এইভাবেই তৈরী করে দিয়েছেন। আমরা যেসব কেমিক্যাল ড্রাগস ব্যাবহার করি তার ২৫% বিভিন্ন হারবাল উপাদান থেকে সংগ্রহ করা এবং বাকি উপাদান গুলোও বিভিন্ন কেমিক্যাল উপাদানের মাধ্যমে সিনথেটিক ফর্মে তৈরী করে আমাদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

আমার এই কথাগুলা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমরা মাছ চাষে বিভিন্ন অভিযোগ করি, আফসোস করি যে এতকিছু করার পরেও আমার মাছের কাংখিত গ্রোথ হচ্ছে না, মাছের রঙ সুন্দর হচ্ছে না, মাছের কিছুদিন পরে পরে বিভিন্ন রোগ বালাই হচ্ছে। এইসব করতে গিয়ে অনেক খরচ হয়ে যাবার ফলে কাংখিত লাভ করতে পারছি না , মাছ এক্সপোর্ট করতে পারছি না এই ধরনের বিভিন্ন অভিযোগ আমাদের আছে। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছি কি আমরা মাছের রোগ হওয়ার পরে প্রতিষেধক হিসেবে যতটা ভাবি, রোগ না হওয়ার জন্য প্রতিরোধকের কথা কি ততটা ভাবি ? যারা অনেক উন্নত পরিবেশে থাকে, উন্নত খাবার খেয়ে জীবন ধারন করেন তাদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে এবং রোগ বালায় তেমন একটা থাকে না। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় ৪০/৫০ বছর হওয়ার সাথে সাথে আমরা আমাদের বিছানা, ডাক্তার, ওষুধ এইসব প্রস্তুত করে ফেলি । কারন আমাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবন এবং খাদ্যাভ্যাস । মাছ চাষে লাভ করার জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে খরচ কমানো । আর এই খরচ কমানোর প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে প্রাকৃতিক উপাদানের সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করা ।

আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর পরিমানে নীম, সাজনা,তুলসি,পেপে,পান,বাঁশ, কলাগাছ ইত্যাদি পাওয়া যায় অথচ এইসবের মাঝেই লুকিয়ে আছে মাছ চাষের খরচ কমানোর সব রহস্য। আমি একটু চেষ্টা করব এইসবের ব্যবহার বাড়িয়ে কিভাবে কেমিক্যাল ড্রাগসের ব্যবহার কমিয়ে আমরা অল্প খরচে সর্বাধিক নিরাপদ মাছ উৎপাদন করি সেটা সম্পর্কে বলতে। কিছুদিন পূর্বে আমাদের শ্রোদ্ধেয় হামিদুল ভাই ইন্দোনেশিয়া সফরে গিয়ে বিভিন্ন বড় বড় খামার ভিজিট করে দেখেছেন তারা কিভাবে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে অল্প সময়ে অনেক বেশি পরিমান মাছ উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছে। একটা ছোট উদাহরণ দেই শিং মাছের সবথেকে বড় সমস্যা হচ্ছে ক্ষত রোগ । আর আমরা এটার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করি অথচ ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এ মাত্র ৪০ টাকা দিয়ে হারবাল ঔষধ কিনতে পাওয়া যায় যেটা দিয়ে ১০০ শতকের পুকুরের শিং এর ক্ষত রোগ ৩ দিনে সেরে ফেলা সম্ভব। কাজেই আপনি বুঝতে পারছেন কত পরিমান অর্থ এখানে সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে। যেহেতু আমরা অত্যধিক পরিমান কেমিক্যাল ড্রাগস এর উপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি তাই এই ট্রেন্ড থেকে বের হতে হইতে অনেক সময় লাগবে কিন্তু বিশ্বাস করুন এই ট্রেন্ড থেকে বের হতে না পারলে আমরা কখনই কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারবো না।

তাই এখনই উদ্দোগী হয়ে হারবাল ওষুধের দিকে আমাদের ঝুঁকতে হবে। আমি অল্প কিছু হারবাল উপাদান যেগুলা আমাদের আশে পাশে প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায় ওইসব উপাদান আমাদের মাছ চাষে কতটা উপকার করতে পারে সেটা বলার চেষ্টা করবো । এগুলার ফলাফল FAO ছাড়াও পৃথিবীর অনেক নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।

নিমের ব্যবহার ;
আমাদের দেশে প্রচুর পরিমান নীম গাছ পাওয়া যাই যার মদ্ধে প্রচুর বায়োলজিক্যাল এক্টিভিটি যেমন পেস্টিসাইডস, আন্টিফিডেন্টস, সাইটোটক্সিক গুনাগুন আছে । কিছু প্রচুর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আছে যাদের ক্ষতিকর আক্রমন থেকে নীম সবথেকে কার্যকরী ভুমিকা পালন করে থাকে। নীমের কিছু যৌগিক উপাদান থাকে যেগুলা ক্ষতিকর ভাইরাসকে ঘিরে ফেলে ফলে ওইসব ভাইরাস মাছের শরীরে কোন ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। প্রাকৃতিকভাবে ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত করতে নীম সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা) ইমিউনো সিস্টেম কে উন্নত করার জন্য নীম অসাধারন ভুমিকা পালন করতে পারে। রোগাক্রান্ত পুকুরের ৪ দিকে আঁটি বেঁধে শতক প্রতি ৭/৮ টা করে নিমের ডালের গোছা রেখে দিলে ভাল ফলাফল পাওয়া যাবে। তবে সব থেকে ভাল ফলাফল পাওয়া যায় যদি পানির প্রবাহের মধ্যে সরাসরি রাখা যায় ।

তুলসীর ব্যবহার;
অ্যান্টিবডি তৈরির অসাধারন ক্ষমতা আছে তুলসির। নিয়মিত তুলসির ব্যাবহার মাছের মরটালিটি যেমন উন্নত করে ঠিক তেমনি প্রাকৃতিক গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে কাজ করে। তাই বাজারের গ্রোথ প্রমোটার বাদ দিয়ে আমরা আমাদের উঠানের পিছনে যে তুলসি গাছ আছে সেটাকে কেন ব্যবহার করব না? তাছাড়া ইমিউন সিস্টেম উন্নত করতে অনেক বড় ভুমিকা পালন করে তুলসি। তুলসির পাতা, ডাল , শিকড়, ফুল এমনকি পুরোটাই পুকুরে ব্যবহার করার উপযোগিতা আছে। শতক প্রতি ১০পিপিএম ১৫ দিন পর পর ব্যাবহার করলে ভাল ফলাফল পাওয়া যাবে।

কলমি শাকের ব্যবহার :
গবেষণায় দেখা গেছে মাছের কটনমাউথ রোগের সবথেকে বড় আন্টিমাইক্রবায়াল হিসেবে কলমি শাকের ব্যবহার সবথেকে বেশি কার্যকরী । প্রতি ১০ টন পানির জন্য ৩০ গ্রাম পাতা ভিজিয়ে প্রয়োগ করলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

রসুনের ব্যবহার:
রসুন হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক তৈরি সবথেকে বড় প্রাকৃতিক এন্টিবায়োটিক । কাঁচা রসুনে এলিসিন থাকে, যা অসংখ্য রোগের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে থাকে। অল্প একটু রসুন ব্যবহার করাই অনেক বেশি কার্যকর । হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর রোগ প্রতিরোধক হিসেবে প্রাকৃতিকভাবে রসুন সব থেকে কার্যকরী ভুমিকা পালন করে থাকে। পুকুরে খাবার প্রয়োগের পূর্বে প্রতি ১০০ কেজি মাছের জন্য ১০ গ্রাম রসুন ৩ দিন পর পর প্রয়োগ করলে মাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে। তাছারা EUS রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ২কেজি লবন, ২কেজি রসুন, ২০গ্রাম পটাশের সাথে ৪০ লিটার পানিতে মিশিয়ে আনুমানিক ৩০ শতকের পুকুরে ছিটিয়ে দিলে এই রোগ অবশ্যয় দুর করবে। এছারা gastrointestinal distress এর প্রতিষেধক হিসেবে আদার ব্যবহার খুব জনপ্রিয়। গ্রোথ প্রমোটার হিসেবে সয়ামিলের সাথে কাচা পিঁয়াজের মিশ্রণ অনেক কার্যকর ভুমিকা পালন করে থাকে। তবে কেমিক্যাল ফরমেশনের কারনে এটা তেলাপিয়ার উপর সবথেকে বড় ভুমিকা পালন করে। তেলাপিয়া অতি দ্রুত সময়ে বৃদ্ধি পায়। (চলবে)

পরবর্তী সংখ্যা পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন এগ্রিভিউ২৪.কম।

লেখক:

আহসানুল আলম জন
স্বত্বাধিকারি
পল্লী ফুড ফারমস
hello@pollifood.com

About Mostafizur Rahman

Check Also

শেকৃবি এলামনাই এসোসিয়েশন এর অভিষেক ও পুনর্মিলনী ২০১৮ অনুষ্ঠিত

নাজমুস সাকিব, শেকৃবি প্রতিনিধিঃ জাঁকজমক পূর্ণভাবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) এলামনাই এসোসিয়েশন’র অভিষেক ও পুনর্মিলনী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *