Wednesday , April 25 2018
সর্বশেষ
Home / কৃষি গবেষনা / চন্দ্রমল্লিকার বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার

চন্দ্রমল্লিকার বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার

ফুল সৌন্দর্য্যের প্রতীক। পৃথিবীর সব দেশেই বিভিন্ন জাতের, বিভিন্ন রংয়ের ফুলের চাষ হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও তেমনি প্রায় সব ঋতুতেই ফুল পাওয়া যায়, তবে শীত মৌসুমেই সব চেয়ে বেশী ফুল পাওয়া যায়। অন্য ফসলের মত ফুলও যথেষ্ট অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। এদেশের মানুষ আজকাল ফুলের নানাবিধ ব্যবহার শিখেছে, তাই ফুল এদেশের বিভিন্ন জেলায় চাষ শুরু হয়েছে এবং এরই সাথে ফুলের বিভিন্ন সমস্যাও দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সমস্যা গুলোর মধ্যে ফুলের রোগ বালাই একটি অন্যতম। নিন্মে চন্দ্রমল্লিকা ফুলের প্রধান প্রধান রোগ এবং তার প্রতিকার ব্যবস্থা বর্ননা করা হলো।

 

ঢলে পড়া (Wilt) রোগ

রোগের কারনঃ ফিউজারিয়াম অক্সিস্পোরাম (Fusarium oxysporum) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ

ছত্রাকটি মাটি ও বীজ কন্দে বেঁচে থাকে। উষ্ণ আবহাওয়া, বেশী বৃষ্টিপাত ও হালকা মাটিতে এ রোগটি বেশী দেখা যায়। কম পরিমানে ফসফেট ও বেশী পরিমান নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করলেও রোগটি বাড়ে।

রোগের লক্ষণঃ

  • কন্দ আক্রান্ত হলে পঁচে যায় ।
  • আক্রান্ত গাছের ডাল ও পাতা নেতিয়ে পড়ে।
  • পরবর্তীতে সবগুলো ডাল ঢলে পড়ে এবং গাছ মারা যায়।

রোগের প্রতিকারঃ

  • রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে।
  • এ রোগ হয় না এমন ফসলের সাহায্যে শষ্য পর্যায় করতে হবে।
  • রোগমুক্ত বীজ কন্দ সংগ্রহ করতে হবে।
  • কন্দ তোলার সময় আঘাত জনিত ক্ষত এড়াতে হবে।
  • সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। নাইট্রোজেন সার ভেংগে ভেংগে প্রয়োগ করতে হবে।
  • কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে  ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে কন্দ আধা ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে ছায়ায় শুকিয়ে নিয়ে জমিতে রোপন করতে হবে।
  • জমিতে রোগ দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় মাটিতে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

 

পাতা ঝলসানো (Leaf blight) রোগ

রোগের কারনঃ সেপটোরিয়া ক্রিসানথেমি (Septoria chrysanthemi) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ অসময়ে বৃষ্টিপাত হলে রোগটি বাড়ে।

রোগের লক্ষণঃ

  • নীচের পাতায় প্রথমে হলদে, ছোট ছোট দাগ হয়।
  • পরে দাগগুলি গাঢ় বাদামী বা কালো হয়ে যা য়।
  • ছোট দাগগুলির উপর আতস কাঁচ ধরলে অসংখ্য সাদাা স্পোরের স্তুপ দেখা যায়।
  • শুরুতে দাগগুলি কয়েক মি.মি. থেকে দুই সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়।
  • আকৃতিতে অনির্দিষ্ট হলেও শিরার প্রভাবে লম্বাটে ইংরাজী V অক্ষরের মত হয়।
  • এগুলি বেড়ে পাতাটি ঝলসে যায়।
  • মাটির সংস্পর্শে আসা পাতাগুলি রোগাক্রান্ত হয়ে ঝলসে যায়।
  • পাতাতে রোগ বেশী হলেও ডগা ও ফুলেও আক্রমন ঘটে।

রোগের প্রতিকারঃ

  • গাছের গোড়াতে খড় জাতীয় মালচ্ ব্যবহার করলে তলার পাতার আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম থাকে।
  • পরিমিত সেচ প্রদান করতে হবে এবং সেচের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন গোড়ার পাতা না ভিজে।
  • জমিতে রোগ দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম অথবা ট্রাই ব্যাসিক কপার সালফেট (যেমন-কিউপ্রোক্স্যাট ৩৪৫ এসসি) ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার গাছে স্প্রে করতে হবে।

 

সাদা গুড়া (Powdery mildew) রোগ

রোগের কারনঃ এরিসাইফি পলিগনি (Eryshphe polygoni) নামক ছত্রাক দ্বারা এরোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ

আর্দ্র ও ছায়াচ্ছন্ন স্থানে রোগটি বেশী হয়। অল্প জায়গাতে বেশী গাছ থাকলেও রোগ বাড়ে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ও রাতে ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করলে এ রোগের প্রকোপ বেশী হয়।

রোগের লক্ষণঃ

  • পাতার উপর পিঠে সাদা পাউডারের মত অসংখ্য গুড়া দেখা যায় যা ছত্রাক স্পোর।
  • পরে সমস্ত পাতায় এই সাদা আস্তরণ ছড়িয়ে পড়ে।
  • আক্রান্ত পাতা ফ্যাকাশে হয়ে শুকাতে থাকে।
  • পরবর্তীতে পাতা শুকিয়ে ঝড়ে যায় ।
  • ফুল ও কলি বড় হয় না।
  • ফলে ফুলের ফলন অত্যধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

রোগের প্রতিকারঃ

  • গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে।
  • রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করতে হবে।
  • রোগের প্রকোপ কম হলে দ্রুত বেগে পানি স্প্রে করেও দমন করা যায়।
  • সোডিয়াম বাইকার্বোনেট (যেমন-বেকিং সোডা) ১ লিটার পানিতে ৫ গ্রাম হারে  মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৫ বার স্প্রে করতে হবে।
  • রোগ দেখা মাত্রই সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক (যেমন-থিয়োভিট ৮০ ডব্লিউজি বা কুমুলাস ডিএফ) ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে অথবা প্রোপিকোনাজোল (যেমন-টিল্ট ২৫০ ইসি) ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে  মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

 

ব্যাকটেরিয়া জনিত ঢলে পড়া (Bacterial wilt) রোগ

রোগের কারনঃ আরউইনিয়া ক্রিসানথেমি (Erwinia chrysanthemi) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তারঃ জীবানু মাটিতে বসবাস করে। মাটির আর্দ্রতা বেশী হলে রোগ বাড়ে।

রোগের লক্ষণঃ

  • কাটিং-এ আক্রমন হলে গোড়াতে কালো বা বাদামী রংয়ের পচন দেখা যায়।
  • ডাঁটার উপরেও পচন দেখা যায়।
  • মাঝে মাঝে পাতার কিনারে ঝলসে যায়।
  • ফলে গাছটি ঝিমিয়ে পড়ে ও মারা যায়।

রোগের প্রতিকারঃ

  • রোগমুক্ত বীজ কন্দ সংগ্রহ করতে হবে।
  • রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে।
  • এ রোগ হয় না এমন ফসলের সাহায্যে শষ্য পর্যায় করতে হবে।
  • কন্দ তোলার সময় আঘাত জনিত ক্ষত এরাতে হবে।
  • ব্যাকটেরিয়া নাশক মিউপিরোসিন (যেমন-ব্যাকট্রোবান) ১ লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হারে মিশিয়ে চন্দ্রমল্লিকার কাটিং বা কন্দ আধা ঘন্টা ডুবিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে নিয়ে রোপন করতে হবে।
  • জমিতে রোগ দেখা দিলে ব্যাকটেরিয়া নাশক মিউপিরোসিন (যেমন-ব্যাকট্রোবান) ১ লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।

 

বিজ্ঞানী ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান
উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব)
মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই
শিবগঞ্জ, বগুড়া।
মোবাইলঃ ০১৯১১-৭৬২৯৭৮
ইমেইলঃ zaman.path@gmail.com

About Editor

Check Also

পাহাড়ের কাজু বাদাম এখন জমিতে!

এগ্রিভিউ২৪ ডেস্কঃ বাংলাদেশে প্রথম কাজু বাদাম হত পাহাড়ী এলাকায়। অন্য কোথাও তেমন দেখা যেতনা। তাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *