Wednesday , April 25 2018
সর্বশেষ
Home / কৃষি বিভাগ / খিলক্ষেত : দি গ্রেট ভয়েজ

খিলক্ষেত : দি গ্রেট ভয়েজ

নূর-ই-কুতুবুল আলম, খুবি থেকে: শিরোনামখানা পড়ে যে কেউ চমকে যাবে এটা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটা যে কেন সমুদ্র যাত্রার সাথে তুলনা করলাম সেটা ঘটনার মাঝেই জানা যাবে। যাইহোক, ঘটনার ভেতরে প্রবেশ করা যাক এবার।

তখন ২০১৭ সালের এপ্রিলের শেষের দিকের কথা। ফেসবুকে একটা অদ্ভুত ইভেন্টের সন্ধান পাই। অদ্ভুত বলছি তার কারণ এমন ইভেন্ট সচরাচর চোখে পড়ে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাইড্রোপনিক্সের প্রোগ্রামের (BADC, গাজীপুর) দিনে ইভেন্টটি পড়ে যাবার কারণে যাওয়া হয়নি। তাতে ক্ষতি কি, ভাবলাম ছাগল-ভেড়া নিয়ে যেহেতু একটা প্রোগ্রাম হচ্ছে তাহলে একটা ঢু মারা যেতেই পারে!

১৮ই মে, রাত ১০টা বাজে।  নৈশকোচে মোটামুটি একটা সিটের ব্যবস্থা পূর্বেই করা ছিলো। আহা, রাতে ভ্রমণ ছেলেটির কাছে নতুন কিছু না হলেও সেই রাতটা ছিলো একদমই আলাদা!  প্রকৃতি ছিলো অসাধারণ। ঢাকায় অবস্থানরত বন্ধুর সাথে ফোনের পর ফোন। বন্ধুর আগমনের খবরে বন্ধুবর রাজ্জাক আহ্লাদে আটখানা!
ভোরে মোটামুটি বাস থেকে নেমে রাজ্জাককে ফোন করে করে আমি হতাশ!  ভদ্রলোক নিজে বললেন যেন তাকে ফোন দেয়া হয় এবং সে নিজে এসে আমাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু বিধিবাম! বন্ধুর ঠিকানা মোটামুটি জানা ছিলো বিধায় একটা বাস কাউন্টার থেকে শুনে নির্ধারিত লোকাল বাসে করে চড়ে বসলাম মিরপুর ১২র উদ্দেশ্যে। অবশ্য যথাসময়েই বন্ধুর ফোন পেয়ে যাই, রাজ্জাককে পারলে কাবাব বানিয়ে দেই, ১০-১২বার ফোন দিয়ে তারপর তার খোঁজ মিলে। বাস থেকে নেমে বন্ধুকে আবার খুঁজে ফিরি। পাওয়া গেলো অবশেষে। মেসের সন্নিকটে একটা রেস্টুরেন্ট। নাস্তা সেরে মেসে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। যথাসময়ে দুজন বাসের উদ্দেশ্যে বের হই। বন্ধুর সমস্যা থাকার দরুন আমাকে বাসে তুলে নিজের কাজে চলে যায়।
এয়ারপোর্ট রোডের কাছে খিলক্ষেত নেমে পড়ি। রাস্তার পূর্ব দিকে মান্নান প্লাজা, সেদিক রাস্তা ধরেই এগুতে হবে। একটা রিক্সা ঠিক করলাম, মামা ১০০/- চেয়ে বসলেন। কেন চাইলেন সেটা প্রথমে বুঝিনি। পরে রিক্সাওয়ালা মামা নিজেই ৮০/- বললেন। হাতঘড়ি দেখলাম, সময় মোটামুটি পার হয়ে যাচ্ছে। এমনিই বাজে প্রায় ৯টা। অনুষ্ঠান বুঝি শুরু হয়ে গেলো! রিক্সায় উঠে মনে মনে আওড়ালাম, দেখা যাক কতদূর যাওয়া হয়! রাস্তা ছিলো ভাঙা, আর পানিতে ভরা। বুঝতে বাকি নেই, মামা কেন ভাড়া এতো বেশি ধার্য করেন! পথ যেন আর শেষই হয় না। মামা বেশ কষ্ট করেই রিক্সা টানতে থাকলেন। একবার এই মোড় তো আরেকবার এই মোড়! ইচ্ছা করছিলো মামাকে নিয়ে ফিরে যাই আর অর্গানাইজারদের ফোন দিয়ে ক্রোধ মেটাই। রাজপাড়া ট্রান্সমিটার মোড়ে আসতেই ইভেন্টে দেখা লোগো সম্বলিত প্ল্যাকার্ড রাস্তায় গেড়ে দেয়া আছে। সেটা দেখে দেখেই আগাতে থাকলাম রিক্সা নিয়ে। মামাকে ভাড়া বুঝিয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ধাক্কা খেলাম। এ কি, এখনো তো কিছুই শুরু হয়নি। দীপ্ত টেলিভিশন থেকে লোক এসেছে, ওরা সেট ঠিক করা নিয়েই ব্যস্ত। অর্গানাইজার দেখেই জানতে চাইলেন আমি Participant কিনা। মাথা নাড়তেই বসার ব্যবস্থা হলো। প্যান্ডেলের মাঝে কিছু টেবিল, একটা স্টেজ। চেয়ার নিয়ে একটা টেবিলে আশ্রয় গেড়ে নিই।
আস্তে আস্তে লোকজন আসা শুরু হয়। প্রায় এক ঘন্টা পর শুরু হয় প্রোগ্রাম। অর্গানাইজাররা অল্প বক্তব্য দিয়ে ডাঃ তাহমিদের (ACI Ltd. এ কর্মরত) কাছে মাইক্রোফোন ছেড়ে দেয়। শুরু হয় আসল খেলা! ডাঃ তাহমিদ অত্যন্ত মজার একজন মানুষ। মানুষটি ছোটখাটো হলেও যে রসের হাড়ি সেটা খানিক বাদেই বোঝা গেলো। ছাগলের সায়েন্টিফিক নেম নিয়ে যখন উনি কথা বলছিলেন, তখন আমি মুখস্ত সায়েন্টিফিক নেম আউড়ে ফেললাম, অনার্স ১-২ টার্মে লাইভস্টকের একটা কোর্স থাকার সুবাদে অল্প অল্প বুঝতে পারছিলাম সবকিছু। একে একে দেখলাম শিং সংক্রান্ত কিছু তথ্য, জানলাম কেন ছাগল আর ভেড়া আলাদা। ডাঃ তাহমিদের ভাষ্য, ছাগলরা আসলেই ছাগল না, তারা বিশেষ শ্রেণীর ভদ্রলোক বটে! খাবারের ব্যাপারে ওরা অনেক স্পেসিফিক। অপরদিকে ভেড়ারা তেমন নয়, যা পাবে তাই দিয়েই উদরপূর্তি করে নেয় ওরা। ছাগলের সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্র যেন এই ভেড়া। ধীরে ধীরে জানা গেলো কি কি রোগে ছাগল-ভেড়া আক্রান্ত হয়, কেন আক্রান্ত হয়, কি কি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, ফার্ম কিভাবে করলে ভালো হয় ইত্যাদি। জুম্মার নামাজ শেষে খাওয়াদাওয়া। লাঞ্চ শেষে অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে চলে আসে। তবে বিকাল শুরু হতেই প্রচণ্ড বজ্রপাত আর ভারীবর্ষন। দীপ্ত টেলিভিশন চ্যানেলের ক্রুরা তাদের সামগ্রী নিয়ে হিমশিম খায় অবস্থা। ডেকোরেটরের ক্রুরাও ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে আমরা নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় অবস্থান পরিবর্তন করছি বারবার। পানি বেয়ে পড়ছিলো কিছু জায়গায়। তবুও ডাঃ তাহমিদ আর ডাঃ মাইনুল (অনুষ্ঠানে পরে যোগ দেন) দুজনেই প্রোগ্রামটাকে ভালোভাবেই শেষ করেন। যেভাবে বজ্রপাত হচ্ছিলো তাতে ভয় পেয়েছিলাম খুব, এই বুঝি জানটা চলে যাবে!
ভারীবর্ষন অনুষ্ঠান শেষ করার খানিক বাদেই নেমে যায়, তবে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছিলো। হেটে হেটে বড়ুরা বাগান বাড়ি, তিন রাস্তার মোড়ের সামনে আসতেই আঁতকে উঠি! একি, চারিদিকে খালি পানি আর পানি! সমুদ্রযাত্রা কেন বলেছিলাম শিরোনামে এবার আশা করি বোঝা গেছে!  কোনোভাবে ইজিবাইক ধরে চলে আসি মান্নান প্লাজার সামনে। বাস ধরে ভুলক্রমে নেমে পড়ি মিরপুর ১১তে। জায়গাটায় বেশি যাতায়াত নেই তাই মিরপুর ১১.৫ এর ব্যাপারেও তেমন জানতাম না। রাজ্জাক আমাকে ১১.৫ তে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দেয়। এদিকে আমি রেগে আগুন, পরে বিষয়টা বুঝতে পেরে নিজেকেই অপদার্থ  মনে হচ্ছিলো। প্রায় ২০ মিনিট খোঁজাখুঁজির পর বন্ধু বুঝে যায় আমি আসলে কোথায়! দেখা হবার পর বুঝলাম, ন্যাড়া আসলে বেলতলায় একবার না বারবারই যায়! এবং সেটা আমিই প্রথম প্রমাণ করলাম। মিরপুর ১১ তে কিছু শপিংমলে বাতাস খেতে ঢুকে গেলাম। আহা, ফ্রিতে যদি শীতল পরশ মিলে তাহলে ফ্রি ভিজিটই ভালো!
ঢাকার বেশ ভেতরে একটা গ্রামাঞ্চলে এভাবে আসবো কখনোই ভাবিনি। ভেবেছিলাম একটা হলরুম ভাড়া করা হবে, অথচ অর্গানাইজাররা তাদের ফার্মের সামনের ফাঁকা জায়গাতেই প্রোগ্রাম এরেঞ্জ করেন। তা সত্ত্বেও, অনেক ভালো লেগেছিলো সেদিন। প্রোগ্রামটা সবমিলিয়ে আমার কাছে ভালো লেগেছিলো।  আমার জীবনের সেরা এডভেঞ্চার (ঘরকুনো ছেলের কাছে এটা এডভেঞ্চার তুল্যই বটে!) হিসেবে এই সফর থাকবে সবচেয়ে উপরে। ও হ্যাঁ, অর্গানাইজারদের সংগঠনের নাম বলেই লেখা শেষ করছি। Bangladesh Goat and Sheep Breeders Association (BGSBA).

About Nur E Kutubul Alam

Check Also

পাহাড়ের কাজু বাদাম এখন জমিতে!

এগ্রিভিউ২৪ ডেস্কঃ বাংলাদেশে প্রথম কাজু বাদাম হত পাহাড়ী এলাকায়। অন্য কোথাও তেমন দেখা যেতনা। তাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *