Wednesday , October 17 2018
সর্বশেষ
Home / পোলট্রি / গরমে মুরগির যত্ন (১ম পর্ব)

গরমে মুরগির যত্ন (১ম পর্ব)

 ডাঃ খালিদ হোসাইনঃ গদ-বাধা যে কোন জিনিসের প্রতি আমার এলার্জি একটু বেশি । চাকুরির সুবাধে খামারীদের নিয়ে অনেক সেমিনার কিংবা গ্রুপ ডিসকাশন করতে হয়, এই ক্ষেত্রে আমি একটু আলাদা ভাবেই এগুতে চাই সবসময় । আমাদের সেক্টরে একটা অলিখিত নিয়ম আছে, তা হলো সেমিনার কিংবা গ্রুপ ডিসকাশনে অনেক লোক হতে হবে, অনুষ্ঠান শেষে একটি বিরিয়ানির প্যাকেট এবং ড্রিংকস এর বোতল ধরায়ে দিতে হবে । এরকম অনেকগুলা সেমিনারে আমি অংশগ্রহন করেছিলাম, আবার এমনও সেমিনার করেছি যেখানে ২ টা খাসি জবেহ দিতে হয়েছে, খাসি না হলে নাকি ডিলারের প্রেসটিজ পাংচার হয়ে যাবে । বরাবরই আমি এই রকম সেমিনার করার বিপক্ষে । আমার অভিজ্ঞতা বলে যত বড় সেমিনার হয় মানুষ তত কম কথা শুনে, সেমিনার শুরু হতে দেরি হয়, আর স্বভাবতই মানুষের আগ্রহ থাকে খাবারের দিকে । 

সেমিনারের মূল উদ্দেশ্য মূলত খামারীদের কিছু শেখানো।  বক্তার চোখের সাথে শ্রোতার চোখে চোখ যত বেশি পড়বে, সেমিনারটি সফল হবার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে । আপনার বক্তব্য শেষে কত বেশি প্রশ্ন পেলেন শ্রোতার কাছ থেকে সেটাও নির্ধারন করে দেয় মানুষ আপনার কথা কতটুকু মনোযোগ দিয়ে শুনছে ।

 

গতবছর এই সময়ে বরিশালে করা আমার সেমিনারটি একটু আলাদা ভাবে করলাম । ১৫ জন খামারী কে নিয়ে করলাম এই গ্রুপ ডিসকাশন টি । সহকর্মী ২ ডাক্তার কে খুব কষ্ট দিলাম কেনাকাটা করার সময় । তাদের দাবি ছিল যে সন্ধ্যায় যেহেতু অনুষ্ঠান তাই অনুষ্ঠান শেষে গার্ডেন ইন থেকে ১৪০ টাকা করে বিরিয়ানির প্য্যাকেট দিয়ে দিলেই তো ভালো হয় । আমি উনাদের দিয়ে গুড়, লেবু, লবন, চিনি, তরল দুধ, কলা, সিংগারা, সমুচা, মিষ্টি, রোল, আরো কয়েক রকমের নাস্তার ব্যবস্থা করালাম (বিরিয়ানি খাওয়ালে যে খরচ হত এই পাগলাটে নাস্তাতেও প্রায় সমান খরচ হয়েছে)।

৩ জন মিলে প্রায় ১ ঘন্টা ধরে কষ্ট করে গুড়ের শরবত বানালাম; ১২ জন খামারি আসল, প্রথমেই তাদের গুড়ের শরবত দিলাম । “গরমে মুরগির যত্ন” এই শিরোনামে কথা বলা শুরু করলাম, কথার মাঝে খামারীদের প্রশ্ন-উত্তর সবই চলছিল, মাঝে নাস্তার বিরতি দিলাম । আবারো প্রোগ্রাম গুরু হল, প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে প্রোগ্রাম শেষ হল । খামারী ভাইদের বিদায় করার আগ মুহুর্তে সবাইকে এক গ্লাস করে সামান্য চিনি মিশ্রিত দুধ দিলাম খেতে আর বলে দিলাম বাসায় যেতে যেতে টের পাবেন পানি পিপাসা কেমন লাগে ।

 

“গরমে মুরগির যত্ন” এই শিরোনামের সাথে গুড়ের শরবত খাওয়ানো কিংবা খামারীদের দুধ চিনি খাওয়ানো সব কিছুরই একটা সুসম্পর্ক ছিল তাই কষ্ট হলেও এই পাগলামিটা সেদিন করেছিলাম । প্রচন্ড গরম পড়ছে, আমরা অনেকেই খামারীদের বুদ্ধি দেই মুরগিকে গুড়ের শরবত খাওয়াতে, খাওয়ানোর পেছনে বিজ্ঞান সম্মত অনেক যুক্তি দেই কিন্তু আমাদের খামারীরা এই যুক্তি গুলা নিতে চান না, কেননা গুড়ের শরবত বানাতে কষ্ট হয় তাদের । গুড়ের শরবত খাওয়ানোর পর সেদিনের খামারীরা নিজেরাই বলতে লাগল যে, শরীরটা তো অনেক ঠান্ডা হয়ে গেল, খুব ফ্রেশ লাগছে । আমি আবার ছোট্ট করে ২ টা কথা বলে দিলাম, গুড়ের শরবত ১৫-১৬ দিন বয়সের পর খাওয়ালে মুরগির ওজন বাড়ে, লিভার টনিকের কাজ করে আবার আমাশয় সমস্যায় ভালো কাজ করে; খামারীরা খুশি, সাথে আমিও ।

 

গরমের সময় খুব কমন সমস্যা মুরগি কম খাচ্ছে, সেটা শুনে লিভার টনিক থেকে শুরু করে অনেক ঔষুধই প্রেসক্রিপশন করা হয় । কিন্তু অধিকাংশ মানুষই খবর নেই না যে মুরগি পানি ঠিক মত খাচ্ছে কিনা? অন্যান্য সময় যেখানে খাবারের দ্বিগুন পানি খাবে সেখানে গরমের মৌসুমে একটি মুরগি যা খাবার খাবে তার সাড়ে তিন থেকে চার গুন পানি খাবে । এই সমস্যার জন্য মুরগির খাওয়া কমে গেলে তা অনেকেই খেয়াল করি না । পানি খাওয়ানো বাড়াতে হবে । অনেক খামারীরা বলে থাকেন যে পানি না খেতে চাইলে কি করতে পারি ? সেই কি করতে পারির উত্তর লুকায়িত ছিল দুধ-চিনি খাওয়ানোর মাঝে । সেমিনার শেষে খামারীদের যখন দুধ-চিনি খাওয়ালাম তখন বলেছিলাম যে বাসায় যেতে যেতে খবর পাবেন পানির পিপাসা কেমন লাগে । বাস্তবেও তাই হয়েছে; যখন দেখছেন মুরগির পানি খাওয়া – খাবার খাওয়ার ৪ গুন হচ্ছে না তখনই দুধ-চিনি (১ গ্রাম নন-ফ্যাট মিল্ক/১ লিটার পানিতে, সাথে ৫ গ্রাম চিনি প্রতি লিটার পানিতে) পানিতে মিশ্রিত করে দিন, দেখেন পানি খাওয়া কতটা বাড়ে (কাউকে এই পরামর্শ দেবার আগে নিজে একবার সত্যতা যাচাই করতে ভুলবেন না) ।

গরমের দিনে মুরগিতে স্ট্রোক প্রতিরোধে খামারে দুপুর বেলা ৪-৫ ঘন্টা (১৫-১৬ দিন বয়সের পর) খাবার বন্ধ রাখুন (শুধু পানি চলবে), স্ট্রোক প্রতিরোধে পানিতে এসপিরিন কিংবা ডিসপিরিন ট্যাবলেট (১ টি ট্যাবলেট ১ লিটার পানিতে) দিতে পারেন, উপকার পাবেন ।

 

লেখাটি বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে তাই এখানেই শেষ করছি তবে পরবর্তী লেখায় “গরমে মুরগির যত্ন-২য় পর্ব” এই শিরোনামে একটি বিশদ লেখা পাবেন ।

 

ও ভালো কথা, আগে যেই ফার্মে ১০০০ মুরগি তোলতেন এখন সেই ফার্মে ৮০০ এর বেশি মুরগি তোলা থেকে বিরত থাকুন; খাদ্য পাত্র ও পানির পাত্রের  সংখ্যা বাড়িয়ে দিন  । 

About Editor

Check Also

ক্ষুধামুক্ত সমাজ গঠনে চাই কৃষিবান্ধব পদক্ষেপ ও খাদ্য অধিকার আইন চাই

বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অর্জিত হচ্ছে ৭% এর উপরে। বিগত মার্চ মাসে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *