Saturday , December 15 2018
সর্বশেষ
Home / প্রথম পাতা / গবাদি প্রাণির প্রজনন সমস্যা (১ম পর্ব)

গবাদি প্রাণির প্রজনন সমস্যা (১ম পর্ব)

ডাঃ মোঃ  মোস্তাফিজুর রহমানঃ মানুষ তার প্রয়োজনের তাগিদে সমাজে অনেক কিছুর ব্যবস্থা করে থাকে।  এর মধ্যে মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি অন্যতম। বসবাসের জন্য যেমন প্রয়োজন সুন্দর পরিবেশ ও নৈতিকতা পূর্ণ সমাজ। পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য সুরক্ষা। আমিষ মানুষের দৈহিক গঠনের জন্য গুরুত্বপুর্ণ একটি খাদ্য উপাদান। এই খাদ্য উপাদান আমাদের পুরন হয় পোল্ট্রি ও গবাদি প্রাণি হতে। ব্রয়লার মুরগির মাংস, লেয়ার মুরগির ডিম ও মাংস, গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের মাংস ইত্যাদি হতে আমাদের প্রাণীজ  আমিষের প্রয়োজন পুরণ হয়।

বাংলাদেশের বর্তমানে আমিষের চাহিদা পুরণে প্রায় সফলতা অর্জিত হয়ে গেলেও দুধ এর চাহিদা পুরণে এখনো অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান থেকে আমরা বর্তমানের পুষ্টির কিছুটা নমুনা পাবো।

এই আমিষের বাকী চাহিদা পুরণ না হওয়ার পিছনে অনেক কারন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সমস্যা হলো প্রজনন সমস্যা। গাভী হিটে না আসা, আর আসলেও তা গর্ভধারণে ব্যর্থ হওয়া, কোন মতে হলেও হয়ত গর্ভপাত হয়ে যায়, প্রতিবছরে একটা করে বাচ্চা এই উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ, বাচ্চা হতে সমস্যা যা ডিসটোকিয়া নামে পরিচিত, ফুল আটকিয়ে যাওয়া, দুধ কমে যাওয়া ইত্যাদি প্রজনন সমস্যার মধ্যে পড়ে। এই সমস্যা গুলোর জন্য যেমন ঠিকমত গবাদীপ্রাণির সংখ্যা চাহিদামত বৃদ্ধি পাচ্ছেনা, পাশাপাশি প্রতিবছর প্রতিটি গাভীর বাচ্চা না হওয়ায় দুধ উতপাদন কম হচ্ছে।

 

প্রজনন কীঃ প্রজনন সৃষ্টিগত ভাবে মহান আল্লাহর একটি অত্যান্ত সুন্দর ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রতিটি প্রাণিই তারই অনুরূপ প্রাণি জন্ম দিতে পারে। যে সকল অঙ্গ এই প্রজননে সরাসরি জড়িত তাদেরকে প্রজনন তন্ত্র বলে। পুরুষ প্রজনন তন্ত্র ও মহিলা প্রজনন তন্ত্র আলাদা তবে এই দুইটারই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রজননের উদ্দ্যেশ্য সফল হয়।

 

বাংলাদেশে গবাদী প্রাণিতে প্রজনন সমস্যা বেশী কেন?

উন্নয়নশীল দেশ গুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আয়তনের তুলনায় এদেশের জনসংখা বেশি তাই সব রকম সুযোগ সুবিধার ঘাটতি দেখা যায়। দেশের উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক মানুষ গবাদীপশু পালন করে থাকে। কিছু অন্যতম কারণে প্রজনন সমস্যা দেখা যায়। তার মধ্যে-

গোপুষ্টির অভাবঃ বাংলাদেশে ব্যবসায়ীক খামার ছাড়া মধ্যবিত্ত¦ ও নিম্ন মধ্যবিত্ত¦ লোকজন এই গরু পালন করে থাকে। যার ফলে ধানের গুড়ো ও শুকনো খড় ছাড়া তেমন পুষ্টিকর খাবার গরুকে সরবরাহ করতে পারেনা। পুষ্টি প্রজননের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ একটা বিষয়। প্রজনন অঙ্গ কে ভালভাবে কাজ করতে হলে প্রয়োজন পুষ্টি। যার ফলে গাভী সহজে হীটে আসেনা, আসলেও তা গর্ভধারণে সক্ষম হয়না। এমনকি বাচ্চা প্রসবের সময় দুর্বলতা ও ক্যালসিয়ামের অভাবে নানা জটিলতা সহ বাচ্চা ও প্রাণির মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে।

জীবাণুর প্রাদুর্ভাবঃ যত্রতত্র কোন নিয়ম না মেনেই খামার করা বা অপরিস্কার ও স্যাতস্যেতে পরিবেশে রেখে গাভী পালন করলে নানা রোগ বালাই ছড়িয়ে পরে। কিছু ছোয়াচে রোগ এক প্রাণি হতে অন্য প্রাণিতে ছড়িয়ে পড়ে প্রজনন ক্ষমতা ব্যহত করে। বিশেষ করে যৌনরোগ যেমন ব্রুসেলসিস এর মাধ্যমে অনেক প্রানির প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। এই রোগটি জুনোটিক রোগ হওয়ায় মানুষ হতে প্রাণিতে এবং প্রাণি হতে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দ্বাড়িয়েছে।

ওষুধের অপপ্রয়োগঃ রেজিস্ট্রার্ড ভেটেরিনারিয়ান ছাড়া যে কেউ যত্র তত্র প্রাণিকে ওষূধ দেয়ার ফলে প¦ার্শপ্রতিক্রিয়ায় এদের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের হাতুড়ে ভেটেরিনারি প্রাকটিশনের কারণে হরমোন ও অপ্রয়োজনীয় স্টেরয়েড ড্রাগ ব্যবহারে প্রজনন হুমকীর মুখে অনেকক্ষেত্রে। তাছাড়া গর্ভবতি গাভীকে কৃমিনাশক ও ক্ষতিকর ড্রাগ দিয়ে বাচ্চা গর্ভপাত হচ্ছে অনেক। যা দেশের প্রচলিত নিয়মই এর জন্য দ্বায়ী হতে পারে।

দক্ষ  এআই টেকনিশিয়ানের অভাবঃ বর্তমানে প্রজননে ষাড়ের চেয়ে কৃত্রিম ভাবে বীজ প্রয়োগ করা হয়। এতে করে যেমন জাত এর উন্নতি হচ্ছে একই সাথে দক্ষ জনবলের অভাবে তা কার্যকরি হচ্ছেনা। আর সিমেন তদারকীর কোন ব্যবস্থা না থাকায় মান নিয়ন্ত্রন হচ্ছেনা। ফলে গর্ভধারন ও বাচ্চা ভাল হচ্ছেনা। বর্তমানে বিভিন্ন কম্পানির সিমেনের নানা ত্রুটি আছে বলেও অভিযোগ করেছেন খামারীরা।

সচেতনতার অভাবঃ গ্রামের মানুষের মধ্যে যারা গাভী লালন পালন করে থাকেন তাদের মধ্যে কিছুটা জ্ঞানের ঘাটতি দেখা যায়। যার ফলে এমন কিছু ঘাস তারা গরুকে খাওয়ায় যা ইস্ট্রোজেন বেশি পরিমাণে ধারণ করে। এই সব ঘাস গর্ভবতী গাভীকে খাওয়ালে তার গর্ভপাত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে।

সীমান্ত থেকে অসুস্থ্য গরু আমাদের দেশে আসছে যা ছোয়াচে এবং গাভীর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে। ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত বাছুর গুলোর মৃত্যুহার অনেক বেশী। আর আমাদের দেশে ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত গরুর আমদানী হয় বেশি। যার মাধ্যমে সুস্থ্য গরুগুলোও ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত হয়।

প্রজনন সমস্যা নিয়ে আমরা খামারীদের কথা চিন্তা করে একটা ধারাবাহিক প্রতিবেদন করবো, যেন সবাই এই সমস্যা গুলোর কারণ ও সমাধান করে প্রজনন ক্ষমতা ঠিক রাখার মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।

যদি প্রথমত আমরা প্রজননের সমস্যা নিয়ে ভাবি তাহলে হবে-

  • স্থায়ী সমস্যা
  • সাময়িক সমস্যা

স্থায়ী সমস্যাঃ এই ধরনের সমস্যা হতে পারে জন্মসুত্রে অথবা মারাত্বক রোগে আক্রান্ত হলে। এতে তেমন চিকিৎসায় কোন সুফল পাওয়া যায়না। প্রাণি কখনো প্রজননে সক্ষম হয়ে বাচ্চা প্রসব করতে পারবেনা।

কারণঃ নানাবিধ কারণে এই স্থায়ী সমস্যা হতে পারে-

ফ্রিমার্টিন (Freemartins)- গাভীর গর্ভাশয়ে জাইগট তৈরির সময় যদি দুইটা স্পার্ম একটি ডিম্বানুর সাথে মিলিত হয়ে যমজ বাচ্চা সৃষ্টি হয়। এবং তা যদি একটি পুরুষ বাছুর ও একটি স্ত্রী বাছুর রুপে পৃথিবীতে ভুমিষ্ট হয় তাহলে প্রায় ৯১% ক্ষেত্রে এই স্ত্রী বাছুরটি বন্ধ্যা হয়। কারণ তার প্রজনন অঙ্গের বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়না। এই সমস্যাকে বলা হয় ফ্রিমার্টিন। তবে এক্ষেত্রে পুরুষ বাছুরটি প্রজনন ক্ষমতা সম্পর্ণ হয়ে থাকে।

হোয়াইট হেইফার ডিজিজ (White heifer disease)- প্রতিটি স্ত্রী প্রাণীর যৌনাঙ্গ পাতলা পদার্  বা হাইমেন দিয়ে আবৃত থাকে এবং তা প্রথম যৌন সঙ্গম কালে ছিন্ন হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে যদি এই পর্দাটা খুব শক্ত বা অভেদ্য তাহলে তা স্থায়ী অবস্থায় থেকে যায়। এসব প্রাণী বাচ্চা গ্রহনে অক্ষম।

প্রজনন অঙ্গের ঘাটতি হলেঃ প্রতিটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সম্পর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ। কোনভাবে যদি তাতে সমস্যা বা ঘাটতি থাকে তাহলে তা উদ্দেশ্য পুরণে ব্যর্থ হয়। প্রাণীর যদি প্রজনন অঙ্গ কম থাকে তাহলে বন্ধ্যা হবে।

ক্রোমোজমের অসামঞ্জস্যতাঃ যদি কোন ভাবে ক্রোমোজমের মিউটেশন কিংবা পরিবর্তন ঘটে তাহলে সে তার স্বাভাবিক কাজের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।

সাময়িক সমস্যাঃ নির্দিষ্ট কারণের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে এই সমস্যা প্রকাশ পেয়ে থাকে। উপযুক্ত কারণ অনুসন্ধান করে চিকিৎসা গ্রহণ করা হলে তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। এটা হয়ত রোগ বালাই কিংবা অপুষ্টি জনিত কারণে হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে গরম না হওয়া বা দেরিতে গরম হওয়া, ফলিকুলার সিস্ট, লুটিয়াল সিস্ট, সাইলেন্ট হিট সো করা , অকালে গর্ভপাত হয়ে যাওয়া ইত্যাদি বোঝায়। একে একে সকল সমস্যা তার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানবো আজকে গরম দেরীতে হওয়া বা এনেস্ট্রাস নিয়ে আলোচনা করবো।

অনেক খামারের বকনা বাছুর বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া সত্তেও এবং দেরিতে বা কখনোই ডাকে আসে না এবং প্রসবের ৩ মাস পর অনেক গাভীর ডাক দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে যথা সময়ে গরম না হলে তাকে এনস্ট্রাম বলে। বাংলাদেশে প্রায় ৮৬ ভাগ ক্ষেত্রে এনস্ট্রাম পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে এটা কোনো রোগ নয় তবে কতগুলো সমস্যার উপসর্গ স্বরূপ। গাভী যেমন অনেক সময় পাল ধরে রাখে না বা বারে বারে গরম হয় তেমনি গাভী আবার একেবারেই গরম নাও হতে পার।

 

(চলবে)

About Editor

Check Also

টেরিটরি নির্বাহী পদে নিয়োগ দিচ্ছে ACI Godrej Agrovet Private Ltd.

এগ্রিভিউ২৪ জব ডেস্ক :   ACI Godrej Agrovet Private লিমিটেডে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বিডিজবসের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *