Monday , June 25 2018
Home / পোলট্রি / মুরগির ক্যানাবলিজম এর কারণ ও প্রতিকার ব্যবস্থা…

মুরগির ক্যানাবলিজম এর কারণ ও প্রতিকার ব্যবস্থা…

ডাঃ মো. মোস্তাফিজুর রহমানঃ মুরগির খুবই পরিচিতি এবং মারাত্মক সমস্যা একটি “ক্যানাবলিজম” । এই স্বভাবের মুরগির বৈশিষ্ট্য হলো অপর মুরগিকে ঠোকরানো, দেহের বিভন্ন জায়গায় ঠোকরায় বিশেষত মুরগির ভেন্ট (ডিম দেয়ার ও পায়খানার রাস্তার উপরের স্থান) এ । মূলত বড় মুরগির ক্ষেত্রে বেশী দেখা যায় এবং এটি লেয়ার মুরগির একটি বদভ্যাস । এটা মুরগির পায়ুপথের নরম মাংসে আঘাত করে রক্ত গ্রহন করে ফলে মুরগির রক্তক্ষরন হয় এবং উৎপাদন কমে যায় । অনেক সময় এর ফলে মুরগির মৃত্যুও ঘটে থাকে । আর মুরগি যদি একবার রক্তের স্বাদ পায় তাহলে সে অন্য মুরগিকেও ঠোকরাতে থাকে এবং এই অভ্যাসটি পুরো ফ্লকে ছড়িয়ে পড়ে ।

যে সমস্ত কারনে মুরগির ক্যানাবলিজম হয় তা নিম্নে দেয়া হলোঃ

১। মুরগির ঘনত্ব বৃদ্ধিঃ মুরগিকে তার প্রয়োজন মত জায়গা দিতে হয় । সেক্ষত্রে যদি তার জায়গার ঘাটতি হয় সেক্ষত্রে এই বদভ্যাস শুরু হয়ে যেতে পারে । বাচ্চার জন্য নির্ধারিত জায়গা হলোঃ

  • ১/৪ স্কোয়ার ফিট প্রতি বাচ্চার জন্য প্রথম ২ সপ্তাহ
  • ১/২ স্কোয়ার ফিট প্রতি মুরগির বাচ্চার জন্য ৩-৮ সপ্তাহে
  • ১ স্কোয়ার ফিট প্রতি মুরগির জন্য ৮-১৬ সপ্তাহু
  • ১.৫ স্কোয়ার ফিট প্রতি মুরগির জন্য ১৬ সপ্তাহের পর থেকে । এর কম হলে ক্যানাবলিজম দেখা যায় ।

২। অতিরিক্ত তাপঃ যখন মুরগির খামারে অসহ্য গরম দেখা যায় তখন মুরগির মধ্যে ক্যানাবলিজম মারাত্বক আকারে লক্ষ্য করা যায় । অতিরিক্ত তাপের ফলে মুরগির বিপাক ক্রিয়া ভাল হয়না যার ফলে মুরগির খাদ্যের প্রতি অনিহা দেয়া যায় । গরমে একে অপরের সাথে হিংসাত্মক ভাব প্রদর্শন করে । যার ফলে এক মুরগি অন্য মুরগিকে ঠোকর মারতে থাকে ।

৩। অপর্যাপ্ত খাদ্য ও পানির পাত্রঃ মুরগির জন্য প্রয়োজন সর্বদা পানির সরবরাহ রাখতে হয় । মুরগি তার প্রয়োজন মত পানি পান করতে থাকে । আর এজন্য পানির যথেষ্ট পাত্রের অভাব হলে মুরগির মধ্যে হিংসাত্মক ভাব প্রকাশ পায় । প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পানি ও খাদ্য গ্রহন করে । আর এইসব অবস্থার জন্য মুরগির মধ্যে ক্যানাবলিজমের প্রভাব বেড়ে যায় ।

৪। তাপমাত্রাঃ মুরগির জন্য তাপমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় । তাপমাত্রার খুব কম বেশী হলে তা মুরগির উৎপাদনে ব্যহত হয় । কম বেশী হলে খাদ্যাভাসের পরিবর্তন হয় এবং জৈবিক কার্যক্রমে বাধা প্রাপ্ত হয় । নানান জটিলতা সৃষ্টি হয় । মুরগির জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ৬৫-৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট । এই তাপমাত্রায় মুরগির বিপাকীয় হরমোন গুলো খুব ভালো কাজ করে । আর খুব বেশী তাপমাত্রা হলে ক্যানবলিজমেরও প্রকোপ বেড়ে যায় । ফলে মুরগির কাংক্ষিত মান পাওয়া যায় না ।

৫। মুরগীকে শুধুমাত্র দানাদার খাদ্য খাওয়ানোঃ  মুরগির খাদ্যে পিলেট ও ম্যাশ উভয়ের মিশ্রন থাকা খুব জরুরী । শুধু দানাদার খাদ্য খাওয়ালে মুরগির মধ্যে কিছু বদভ্যাস সৃষ্টি হয় । এদের মধ্যে ক্যানাবলিজম ও অন্যতম । মুরগির দানাদার খাদ্য খেতে খেতে ঠোকরানো প্রভাব বেশী হতে থাকে । তাই পরিমিত দানাদার ও ম্যাস ফিড (গুড়া খাবার) খাওয়ানো উত্তম ।

৬। খাঁচায় অবস্থান সংকটঃ খাঁচায় মুরগি পালন করা হলে নিয়মমত মুরগির জন্য স্থান প্রয়োজন । আর খাঁচায় যদি মুরগী পালন কালে জায়গার ঘাটতি পরে তাহলে খাদ্যের ঘাটতির সাথে মুরগির প্রতিযোগিতা স্বরূপ একে অপরের সাথে মারামারি সহ ঠোকরানো শুরু করে । ফলে ক্যানাবলিজম এর প্রভাব বাড়তে থাকে ।

৭। সময় মত সঠিক চিকিৎসার অভাব হলেঃ  মুরগি কোন জীবণু বা কোন ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে তার সাথে সাথে চিকিৎসার প্রয়োজন । অন্তত তাকে আলাদাকরণ খুব প্রয়োজন ।  আর এই চিকিৎসার যদি কোন ঘাটতি হয় এবং যদি দেরি হয় । তাহলে অন্য মুরগি সেই আক্রান্ত মুরগিকে নতুন করে ঠোকরানো শুরু করে । আর এই অবস্থায়  যদি কোনভাবে রক্তের স্বাদ পায় তাহলে সেই মুরগির মধ্যে এই ঠোকরানোর প্রবনতা বৃদ্ধি পায় এবং এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে খামারের অন্য মুরগির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে যা সহজে রোধ করা কষ্টকর ।

৮। পরজীবী ও উকুনের আক্রমণঃ মুরগি খুব সংবেদনশীল পাখি । অল্পতেই যে বিরক্ত এমনকি ক্ষতির সম্মুখীন হয় । গরম ঠান্ডার বেশী পার্থক্য হলেই  অল্পতেই অসুস্থ্য হয়ে পড়ে । আর মুরগিতে পরজীবির আক্রমণ খুব সাধারন একটা বিষয় । পরজীবির আক্রমণ হলে মুরগি খুব অস্বস্থি বোধ করে । এর ফলে আক্রমনের স্থান চুলকায় । যার কারনে সে নিজের ঠোট দিয়ে তা চুলকাতে চেষ্টা করে । এতে কাজ না হলে পরে অন্য কোন শক্ত জিনিসের সাথে নিজের শরীর লাগিয়ে দিয়ে সেই যন্ত্রনা হতে মুক্তির চেষ্ঠা করে । আর এইরকম অবস্থায় মুরগির পালক উঠে যায় এমনকি মুরগির রক্তক্ষরন ও হতে পারে । যদি মুরগির সেই ক্ষরিত রক্ত কোন মুরগি গ্রহন করে তাহলে সেই মুরগির মধ্যে রক্তের নেশা লেগে যায়। ফলশ্রুতিতে অন্য সুস্থ্য মুরগিকে আক্রমণ করে রক্ত শোষণ করতে শুরু করে । ফলে পরে একসময় তা ব্যাপক হারে মুরগির ফ্লকে ছড়িয়ে পড়ে ।

৯। সময় মত ও সঠিক মাত্রায় মুরগির ঠোক না কাটাঃ  মুরগির ক্ষেত্রে ঠোক কেটে ছোট করা খুবই গুরুত্বপুর্ন । বিশেষত লেয়ার (ডিম পাড়া) মুরগির ক্ষেত্রে । মুরগির ঠোট বেশী বড় থাকলে সে যেমন খাদ্যের অপচয় করে ঠিক তেমনি তার বড় ঠোটের বড়ত্ব দেখিয়ে অন্য মুরগিকে আক্রমণ করে থাকে । আর এই ধরনের মুরগির মধ্যে ডিম খাওয়ার প্রবনতাও বেশী থাকে । এর ফলে মুরগির উৎপাদনের অনেকটা ক্ষতি হয় ।

১০। দীর্ঘক্ষন না খায়িয়ে রাখাঃ মুরগিকে তার প্রয়োজনীয় খাবার সময় মতো খাবার দিতে হয় । দীর্ঘক্ষন খাবার ছাড়া থাকলে মুরগির ভিতরে ফেদার পিকিং এর সংক্রমক বেড়ে যায় । খাবারের তাগিদে তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ।

১১। ঘরে আলোর তীব্রতা বেশী হলেঃ  প্রয়োজন মত আলো মুরগির জন্য খুবই জরুরী । এর তীব্রতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে তা ক্ষতিতে রূপ নিতে থাকে ।

১২। মুরগির বংশগত স্বভাব হলেঃ  কিছু মুরগির বংশগত ভাবে ফিদার পিকিং এ আক্রান্ত থাকে । যার ফলে খামারে তা রোধ করা সহজ হয়না ।

১৩। উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য এবং কম ফাইবার যুক্ত খাবারঃ  মুরগির ক্ষেত্রে অতি উচ্চ শক্তির খাদ্য খাওয়ালেও এই সমস্যা সৃষ্টি হয় । আর খাবারে ফাইবার কম থাকাটাও একটা অন্যতম কারন । যার ফলে ক্যানাবলিজমের স্বভাব বৃদ্ধি পায় ।

 

ক্যানাবলিজম এর প্রতিকারঃ

কথায় আছে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম । ক্যানাবলিজমের ক্ষেত্রেও একই কথা । একবার ক্যানাবলিজম হলে খুব সহজেই তা দূর করা কষ্টকর । তবে কিছু বিষয়ের উপর সজাগ দৃষ্টি দিলে তা নিয়ন্ত্রনে রাখা যায় । যায় এর প্রভাবে ক্ষতির পরিমান কমানো । যে বিষয়ের উপর বিশেষ যত্ন নিতে হবে তা হলোঃ

১। সুষম খাদ্য সরবরাহঃ মুরগিকে তার প্রয়োজন মত সব পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতি ঠিক রেখে সুন্দর ভাবে খাদ্য প্রস্তুত করতে হবে । কোন ঘাটতি যেন না থাকে সেক্ষত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে । ভিটামিন ও মিনারেলের উপর সুনজর রাখতে হবে । আর মুরগি সাধারনত যে অর্গানিক উপাদান গুলো গ্রহন করে থাকে তাই উৎপন্ন মাংস ও ডিমে সরবরাহ করে । তাই তার নিজের খাদ্যে যদি এগুলো উপাদানের ঘাটতি থাকে তাহলে সে দিনে দিনে ঘাটতিতে পড়ে যাবে । আর সব উপাদান ভাল মাত্রায় রাখলে এই ক্যানাবলিজম এর পরিমান অনেকাংশেই কমানো যায় ।

২। পর্যাপ্ত পানির ও খাদ্যের পাত্রের সরবরাহ বাড়াতে হবেঃ মুরগির সংখ্যা অনুযায়ী পাত্রের সংখ্যা নির্ধারন করে তাতে পরিস্কার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে । খাবারের জায়গা সবসময় পরিস্কার রাখার ব্যাবস্থা করতে হবে । খাবার পরিমান মুরগির বয়স অনুযায়ী নির্ধারণ করে মুরগির সংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে প্রয়োগ করতে হবে ।

৩।  সময় মত ডিবেকিং (ঠোট ছোট) করাঃ বর্তমানে সহজ উপায়ে মুরগির ক্যানাবলিজম দূর করার জন্য ডিবেকিংকেই একমাত্র প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা ।  বিশেষত লেয়ার মুরগির ক্ষেত্রে ঠোটের এক তৃতীয়াংশ কেটে দিতে হবে । আর এই সময় মুরগির রক্ত ক্ষরন কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

  • দক্ষ লোক দ্বারা এই কাজ সম্পন্ন করা ।
  • আইরন ব্রান্ড কে পর্যাপ্ত তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা ।
  • সতর্কতার সাথে মুরগিকে ধরা এবং মেশিনে স্থাপন করা ।
  • পরিমান মত ঠোট কাটা বেশি না কাটা ।
  • ঠোট কাটার পর মুরগীর স্ট্রেস (ধকল) কমানোর জন্য ভিটামিন সি অথবা লেবু পানি খাওয়ানো ।

৪। পর্যাপ্ত জায়গার ব্যবস্থা করাঃ সব মুরগিকে তার নিজের সব কাজ সঠিক ভাবে করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সরবরাহ করতে হবে ।

৫। মুরগির ভীড় কমানোঃ বেশি মুরগি একসাথে গাদাগাদি করে যেন না থাকে সে দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে ।

৬। পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে ।

৭। শেডের আলো সব যায়গায় যেন সমভাবে ব্যাপ্ত হয় সে দিকেও ভাল দৃষ্টি রাখতে হবে । লাইট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ৪০ ওয়ার্টের উপর বাল্ব ব্যবহার করা উচিত নয় ।

 

 

লেখক পরিচিতি
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক
হাবিপ্রবি, দিনাজপুর ।
মোবাইলঃ ০১৫২১৫৪৭৮৮২

About Editor

Check Also

আদার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগুণ এবং ব্যবহারের সতর্কতা

এগ্রিভিউ২৪ এক্সক্লুসিভ ডেস্ক:আদা একটি উদ্ভিদ মূল যা মানুষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় । মশলা জাতীয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *