Sunday , July 22 2018
সর্বশেষ
Home / এগ্রিবিজনেস / মিষ্টি পানিতে মুক্তোর চাষ, আছে অপার সম্ভাবনা…

মিষ্টি পানিতে মুক্তোর চাষ, আছে অপার সম্ভাবনা…

তাহজীব মন্ডল নিশাত, পবিপ্রবিঃ মুক্তো কি? মুক্তো একটা প্রাকৃতিক রত্ন এবং এটা মোলাস্ক বা কম্বোজ জাতীয় প্রাণী থেকে উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশ এবং সব জায়গায় একদিকে যেমন মুক্তোর চাহিদা বাড়ছে, তেমনি খুব বেশী মুক্তো তোলা এবং প্রদূষণের কারণে প্রকৃতি থেকে এর জোগান কমে গেছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রচুর পরিমানে মুক্তো নিজের দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য আমদানি করছে। ভারতের ভুবনেশ্বরের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্রেশওয়াটার অ্যাকোয়াকালচার সাধারণ মিষ্টিজলের ঝিনুক থেকে মিষ্টি পানিতে মুক্তো চাষের প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়েছে, যে ঝিনুক সারা দেশের মিষ্টি পানির জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়৷

প্রকৃতিতে একটা মুক্তো তৈরী হয় যখন কোনও বহিরাগত বস্তু যেমন বালির দানা, কীট ইত্যাদি কোনভাবে একটা ঝিনুকের দেহে প্রবেশ করে, এবং ঝিনুক তাকে পরিত্যাগ করতে পারে না ও পরিবর্তে তার উপর স্তরে স্তরে একটি চকচকে আস্তরণ তৈরী করে। সহজ এই পদ্ধতিটি কাজে লাগান হয় মুক্তো চাষে।

চাষের পদ্ধতিঃ মিষ্টি জলে মুক্তো চাষের প্রক্রিয়াতে পরপর ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ থাকে, যথা ঝিনুক সংগ্রহ, অস্ত্রোপচারের আগের প্রস্তুতি, অস্ত্রোপচার, অস্ত্রোপচারের পরের যত্ন, জলাশয়ে চাষ এবং মুক্তো বার করা।

১) ঝিনুক সংগ্রহ মিষ্টি জলের জলাশয় যেমন, পুকুর নদী ইত্যাদি থেকে সুস্থ ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। ওগুলো হাতে করে সংগ্রহ করে বালতিতে বা জলপূর্ণ পাত্রে রাখা হয়। মুক্তো চাষের জন্য ব্যবহৃত আদর্শ ঝিনুকের আকার সামনে থেকে পেছন পর্যন্ত ৮ সেমির বেশি হবে।

২) অস্ত্রোপচারের আগের প্রস্তুতি সংগৃহীত ঝিনুকগুলিকে অস্ত্রোপচারের আগে দুই থেকে তিনদিন বন্দী দশায় গাদাগাদি করে পুরোনো কলের জলে লিটার প্রতি একটি ঝিনুকের অনুপাতে রাখা হয়৷ এই অস্ত্রোপচার-পূর্ববর্তী পদ্ধতিটি চালান হয় অ্যাডাক্টার পেশিগুলোকে দুর্বল করার জন্যে, যা অস্ত্রোপচারের সময় ঝিনুকগুলোকে সহজে নাড়াচাড়ায় সাহায্য করে ।

৩) ঝিনুকের অস্ত্রোপচার অস্ত্রোপচারের জায়গা বিশেষে স্থাপন তিন রকম হয়, যথা ম্যাণ্টল গহ্বর, ম্যাণ্টল কোষকলা ও যৌনগ্রন্থীয় স্থাপন। অস্ত্রোপচার দ্বারা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান বস্তুগুলি হচ্ছে পুঁতি বা কেন্দ্রকণা, যেগুলো সাধারণতঃ ঝিনুকের খোলা বা অন্য কোনও চুনযুক্ত বস্তুর দ্বারা গঠিত হয়।

ম্যাণ্টল গহ্বর স্থাপনঃ এই পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রাণীটির দুটি কপাট খুলে (ঝিনুকের উভয় দিকে আঘাত না লাগিয়ে) ও খোলার সামনের দিকে থেকে ম্যাণ্টলকে সাবধানে আলগা করে গোলাকৃতি (৪-৬ মিমি ব্যাসের) বা পূর্বনির্দিষ্ট ধরনের পুঁতি (গণেশ, বুদ্ধ ইত্যাদির প্রতিকৃতি) ম্যাণ্টল গহ্বরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। উভয় কপাটের ম্যাণ্টল গহ্বরেই স্থাপন করা চলে৷ পূর্বপরিকল্পিত ধরনের পুঁতি স্থাপনের সময় যত্ন নেওয়া হয় যাতে ডিজাইন করা দিকটি ম্যাণ্টলের দিকে মুখ করে থাকে। পুঁতিটিকে যথাস্থানে রাখার পর ম্যাণ্টলকে কেবল খোলসের গায়ে ঠেলে দিলেই স্থাপনের দরুন উৎপন্ন ফাঁকা জায়গাগুলি ভরাট হয়ে যায়৷

ম্যাণ্টল কোষকলা স্থাপনঃ এখানে ঝিনুকগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়; দাতা এবং গ্রহীতা ঝিনুক। এই প্রক্রিয়ার প্রথম কাজ হল গ্রাফ্ট বা জোড় তৈরী করা (ধাত্র কোষকলার ছোট ছোট টুকরো)। এটা করার জন্য একটা দাতা ঝিনুক থেকে একটা ম্যাণ্টল ফিতে তৈরি করা হয় (ঝিনুকের পেটের দিকের ম্যাণ্টলের একটি ফালি), যে ঝিনুকটিকে এ কাজের জন্য মেরে ফেলা হয় এবং ওই ফিতেটি ছোট ছোট (২X ২ মিমি) টুকরোয় কাটা হয়। স্থাপন শুধু গ্রহীতা ঝিনুকে করা হয়, যা দুই ধরনের হয়, যথা কেন্দ্রবিহীন ও কেন্দ্রযুক্ত (নন নিউক্লিয়েটেড ও নিউক্লিয়েটেড)। প্রথমটিতে ঝিনুকের পেটের দিকে অবস্থিত পস্টিরিয়র প্যালিয়াল ম্যাণ্টলের ভিতরের দিকে তৈরি করা পকেট বা গহ্বরে কেবল জোড়ের টুকরোগুলিকেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কেন্দ্রযুক্ত পদ্ধতিতে, একটি জোড়ের টুকরো ও সেই সঙ্গে একটি ছোট কেন্দ্রকণা (২ মিমি ব্যাসের) গহ্বরে ঢোকান হয়৷ দুটো পদ্ধতিতেই সাবধানতা নেওয়া হয় যাতে জোড় বা কেন্দ্রকণা পকেট থেকে বেরিয়ে না আসে। দুটি কপাটের ম্যাণ্টলের ফিতেতেই স্থাপন করা যায়৷

যৌনগ্রন্থীয় স্থাপনঃ এই পদ্ধতির জন্যও গ্রাফট বা জোড় (ম্যান্টল টিস্যু পদ্ধতিতে বর্ণিত) তৈরি করতে হয়। প্রথমে ঝিনুকের যৌনগ্রন্থির ধারে কাটতে হয়। তারপর যৌনগ্রন্থিটিতে একটা জোড় এবং তার সাথে একটা কেন্দ্রকণা (২-৪ মিমি ব্যাসের) এমন ভাবে প্রবেশ করান হয় যাতে জোড় এবং কেন্দ্রকণা নিবিড়ভাবে পরস্পর সংলগ্ন থাকে। এমনভাবে যত্ন নেওয়া হয় যাতে কেন্দ্রকণাটি জোড়ের বাইরের এপিথেলিয়াল স্তরের সাথে লেগে থাকে এবং অস্ত্রোপচারের সময় অন্ত্র কেটে না যায় ।

৪) অস্ত্রোপচারের পরের যত্ন স্থাপন করা ঝিনুকগুলি অস্ত্রোপচারের পরে যত্ন করার জায়গায় নাইলনের ব্যাগে ১০দিন রাখা হয়, অ্যান্টিবায়োটিক এবং প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে। ইউনিটগুলি প্রতিদিন পরীক্ষা করা হয় এবং মরা ঝিনুক এবং যেগুলো কেন্দ্রকণাকে প্রত্যাখ্যান করে সেই ঝিনুকগুলিকে বার করে নেওয়া হয়।

৫) জলাশয়ে চাষ অস্ত্রোপচারের পরের যত্নের পর স্থাপন করা ঝিনুকগুলিকে জলাশয়ে ছাড়া হয়৷ ঝিনুকগুলিকে নাইলনের ব্যাগে রাখা হয় (এক-একটা ব্যাগে দুটো করে) এবং বাঁশের বা পিভিসি পাইপ থেকে ঝুলিয়ে জলাশয়ে ১ মি গভীরতায় রাখা হয়। ১ হেক্টরে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ঝিনুক রেখে চাষ করা হয়। জলাশয়ে মাঝেমাঝে জৈব ও অজৈব সার দেওয়া হয় যাতে প্ল্যাঙ্কটন উৎপাদন অব্যাহত থাকে। চাষের ১২-১৮ মাস সময়কালের মধ্যে মাঝে মধ্যেই ঝিনুকগুলিকে যাচাই করে মরা ঝিনুক বের করে দেওয়া এবং ব্যাগগুলিকে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

৬) মুক্তো তোলা চাষের সময়ের শেষে ঝিনুকের ফসল তোলা হয়। ম্যান্টল কোষকলা বা যৌনগ্রন্থি পদ্ধতিতে জ্যান্ত ঝিনুক থেকে মুক্তো বার করা সম্ভব হলেও ম্যান্টল গহ্বর পদ্ধতিতে ঝিনুকগুলিকে মেরে ফেলতে হয়। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রোপচার করে স্থাপন করা পদ্ধতির ফলে যে মুক্তোগুলো পাওয়া যায় তা হল ম্যান্টল গহ্বর পদ্ধতিতে খোলের গায়ে লেগে থাকা অর্ধ গোলাকৃতি ও প্রতিকৃতি মুক্তো; ম্যান্টল কোষকলা পদ্ধতিতে না লেগে থাকা ছোট অসমান বা গোল মুক্তো এবং যৌনগ্রন্থি পদ্ধতিতে না লেগে থাকা বড় অসমান বা গোল মুক্তো।

 

বাংলাদেশে ঝিনুক চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ

ঝিনুক শিল্প আমাদের দেশে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের নাম। মুক্তার চাষ দেশের জন্য বয়ে আনতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। সেই সঙ্গে সৃষ্টি করতে পারে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ। মুক্তা চাষের ক্ষেত্রে বর্তমানে জাপানের অবস্থান শীর্ষে। এছাড়াও ফিলিপাইন, ফ্রান্স, ইতালি, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, স্পেন প্রভৃতি দেশও মুক্তা উৎপাদনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। তবে এ দেশের মুক্তাবাহী ঝিনুক থেকে সংগৃহীত মুক্তা বিশ্ববাজারে উৎকৃষ্ট মানসম্পন্ন বলে স্বীকৃত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের নোনা পানিতে ৩০০ প্রজাতির এবং মিঠা পানিতে ২৭ প্রজাতির ঝিনুক রয়েছে। তবে বাংলাদেশে ৫ ধরনের ঝিনুকে মুক্তা হয়। যদি প্রণোদিত উপায়ে ঝিনুকে মুক্তার চাষ করা হয় তাহলে দেশে প্রতি বছর এক টন পর্যন্ত গোলাপি মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব। যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তাছাড়া শুধু কুতুবদিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র সৈকত এলাকায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষের মাধ্যমে প্রতি বছর ২০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলেও বিশেষজ্ঞদের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়। এছাড়াও মুক্তা সংগ্রহের পর ঝিনুক দিয়ে তৈরি করা যায় মূল্যবান ও আকর্ষণীয় সামগ্রী। এর মধ্যে লাইটশেড, ঝাড়বাতি, পর্দা, চাবির রিং, টেবিল ল্যাম্প, ঝাড়, ফুল, অ্যাশট্রে, কানের দুল, মালা, হাতের চুড়ি, চুলের ক্লিপসহ বিভিন্ন ধরনের পুতুল, পশু-পাখির মূর্তি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ঝিনুকের এসব সামগ্রীর কদর দিন দিন বাড়ছে।

এছাড়াও ঝিনুক থেকে পান খাওয়ার চুন তৈরি করা হয়। ঝিনুকের গুঁড়া মৎস্য ও পোলট্রি ফার্মে খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে আমাদের দেশে ঝিনুক একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নানা অবহেলা আর অযত্নের কারণে এ শিল্পটি আজ পরিপূর্ণ শিল্পের মর্যাদা লাভ করতে পারছে না। তাই এ শিল্পের দিকে গুরুত্ব দিলে এ থেকে প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে এবং সেই সঙ্গে অনেক বেকারও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।

About Editor

Check Also

প্রাণিসম্পদের উপর জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত প্রভাব

বাংলাদেশের জলবায়ু প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। মাঝে মাঝে খুবই ঠান্ড এবং কখনো অত্যাধিক গরম হচ্ছে। যা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *